ফেরদৌস স্টিলে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক নিহত: ‘নিরাপত্তা অব্যবস্থাপনাই দায়ী’

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিক নিহতের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতার ফলেই এমন মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।

রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনে এসব কথা বলেন বক্তারা। জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের উদ্যোগে কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত। সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় এতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।

‘শ্রমিকের জীবন মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান নয়’

কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, একটি ইয়ার্ডে একই ঘটনায় ৯ শ্রমিকের প্রাণহানি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক। শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই শিল্পের উৎপাদন ও মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান হতে পারে না।

তিনি বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকেও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বন্দর ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক (ডা.) এম আবু সাঈদ বলেন, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু প্রমাণ করে কর্মক্ষেত্রে গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি ছিল।

তিনি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

গ্যাস পরীক্ষা ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিক কেন?

ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক এ এম নাজিম উদ্দিন বলেন, জাহাজের ট্যাংক বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে শ্রমিকদের কাজ করানোর আগে গ্যাস পরীক্ষা ও অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপ করা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং কাজ চলাকালে নিয়মিত গ্যাস মনিটরিং নিশ্চিত করতে হয়।

কিন্তু বাস্তবে এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার প্রশ্ন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের পর্যাপ্ত রেসপিরেটরি মাস্ক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

‘গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট দেওয়া জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস কীভাবে?’

সমাবেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত। তিনি বলেন, যে জাহাজকে ‘গ্যাস ফ্রি’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল, সেই জাহাজের ট্যাংকে কীভাবে বিষাক্ত গ্যাস পাওয়া গেল—এ বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

তিনি প্রশ্ন করেন, গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে যথাযথ পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং সার্টিফিকেট দেওয়ার পরও জাহাজে নিয়মিত গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না।

তপন দত্ত বলেন, জাহাজভাঙা শিল্পে গত ২৫ বছরে একই ঘটনায় এত শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তাই এটিকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি কিংবা দায়িত্বশীলদের অবহেলা ছিল কি না, তা বের করতে হবে।

৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি, দ্রুত প্রতিবেদন দাবি

ফোরামের নেতারা জানান, ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না বলে মন্তব্য করেন তারা।

তাদের দাবি, তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত। তদন্তে যাদের দায় পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

বক্তারা অভিযোগ করেন, জাহাজভাঙা শিল্পে বছরের পর বছর দুর্ঘটনা ও শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের পর দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এতে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের প্রবণতা আরও বাড়ছে।

নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণসহ ৫ দফা দাবি

সমাবেশ থেকে নিহত ৯ শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করারও দাবি জানান শ্রমিক নেতারা।