পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকায় ইসমাইল শরীফ (৬০) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের মাত্র ১৬-১৭ ঘণ্টার মধ্যেই চাঞ্চল্যকর এ হত্যার ক্লু বের করে নিহতের স্ত্রী ও তিন ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল ও বাড়ি থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে সন্দেহ করা রক্তমাখা আলামতও জব্দ করা হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) ভাণ্ডারিয়া থানায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান।
পুলিশ জানায়, রোববার সকাল ৬টার দিকে তেলিখালী ইউনিয়নের বেরিবাঁধ এলাকার দক্ষিণ পাশে একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পায় পুলিশ। খবর পেয়ে ওসি দেওয়ান জগলুল হাসানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে নিহত ব্যক্তি উপজেলার হরিণপালা গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল শরীফ বলে শনাক্ত হয়।
মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর পাশাপাশি পুলিশ ঘটনাটির তদন্ত শুরু করে। প্রথমেই নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগম এবং তিন ছেলে রুবেল শরীফ, রুমান শরীফ ও রাসেল শরীফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কোনো তথ্য না দিয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ওসি জানান, তদন্তের একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে তোলা মরদেহের ছবি ও আলামতগুলো পুনরায় বিশ্লেষণ করা হয়। এ সময় নিহতের মাথা ও কানের পাশে কাঠখেকো পোকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁশের গুঁড়ার মতো কণা দেখতে পান তদন্তকারীরা। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে নিহতের বাড়ির বারান্দা সংলগ্ন স্থানে একই ধরনের গুঁড়া, মাটির ফ্লোরে রক্তের দাগ এবং ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া যায়।
এসব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়, হত্যাকাণ্ডটি অন্য কোথাও নয়, বরং বাড়িতেই সংঘটিত হয়েছে। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ আরও জোরদার করা হলে একপর্যায়ে ছেলে রাসেল শরীফ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পুনরায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে ধারণা করা রক্তমাখা একটি ভারী কাঠের আলামত উদ্ধার করে।
রাতেই সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ করে। তারা রক্তমাখা কাঠের আলামত, মেঝেতে থাকা রক্তের নমুনা এবং অন্যান্য জৈব আলামত সংগ্রহ করেছে। এছাড়া নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগমের শরীরেও রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানায় পুলিশ। উদ্ধার করা আলামত ও নমুনাগুলো ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নিহত ইসমাইল শরীফের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ চলছিল। এ নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। সেই বিরোধের জের ধরেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তবে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভান্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান বলেন, ঘটনার পরপরই আমরা বিভিন্ন সূত্র ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু করি। ঘটনাস্থলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে নতুন কোনো তথ্য বা অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য অল্প সময়ে উদঘাটন এবং সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে ডিএনএ রিপোর্ট ও আরও তদন্ত শেষে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আসবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।