নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ

চসিকের ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা ।। বেতন-ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দেনা শোধে ব্যয় হবে ৪৫ শতাংশ।। চার কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরলেন মেয়র

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আগামী ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এতে নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়, যা মোট বাজেটের ৪৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যয় হবে সড়ক ও অকাঠামোগত উন্নয়ন, মশক নিধন, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ ২৯ খাতে। প্রস্তাবিত এ বাজেটে চসিকের নিজস্ব উৎসে ১ হাজার ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা আয় ধরা হয়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউটে বাজেট ঘোষণা করেন মেয়র। বাজেট অধিবেশনে গত অর্থবছরের (২০২৫–২০২৬) সংশোধিত ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকার বাজেটও ঘোষণা করেন। অর্থবছরটিতে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ২ হাজার ১৪৫ কোটি ৪২ লাখ ৭ সিটি করপোরেশন টাকা। নিজ মেয়াদের দ্বিতীয় বাজেট ঘোষণার সময় তিনি বলেন, নগরবাসীর আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যাশায় ও চট্টগ্রাম মহানগরকে পরিবেশগত ক্লিন–গ্রিন, হেলদি ও সেইফ সিটি, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাসযোগ্য নান্দনিক পর্যটন নগর প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করছি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন এবং প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী । উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : প্রস্তাবিত বাজেটে এডিপির ৬টি উন্নয়ন প্রকল্প এবং রাজস্ব তহবিলের ২৩টি খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ রাখা হয় ১ হাজার ৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গত অর্থবছরে (২০২৫–২০২৬) নগর উন্নয়নে ব্যয় হয় ৯১৬ কোটি ৫০ হাজার টাকা। এবার প্রস্তাবিত বাজেটে এডিপির ৬টি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয় ৮২৫ কোটি টাকা। এডিপির প্রকল্পগুলোর মধ্যে এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প, আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ, পরিচ্ছন্নকর্মী নিবাস নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে যন্ত্রপাতি সংগ্রহ প্রকল্প রয়েছে। গত অর্থবছরে এডিপি প্রকল্পের বিপরীতে খরচ হয় ৭৮৬ কোটি ৯৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এবার রাজস্ব তহবিলের বিপরীতে উন্নয়ন বরাদ্দ গতবারের চেয়ে ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে ২১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়। এ অর্থ ব্যয় হবে সড়কবাতি, রাস্তা ও ফুটপাতের উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধসসহ ২৩টি খাতে। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী গতবার (২০২৫–২৬ অর্থবছর) রাজস্ব তহবিল থেকে নগর উন্নয়নে ব্যয় হয় ১১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। অবশ্য অর্থবছরটিতে রাজস্ব তহবিলের প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ১৮১ কোটি টাকা।

বেতন–ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দেনা শোধে ব্যয় ৪৫ শতাংশ : প্রস্তাবিত বাজেটের বড় একটা অংশ খরচ হবে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতাসহ চসিকের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দেনা পরিশোধে, যা টাকার অংকে ১ হাজার ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা ও মূল বাজেটের ৪৫ শতাংশ। এর মধ্যে দেনা পরিশোধে ১৮৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। গতবার ১৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখলেও ১৬০ কোটি টাকা বকেয়া দেনা পরিশোধ করা হয়। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে চসিকের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ৮২৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতের মধ্যে বেতন–ভাতা ও পারিশ্রমিক পরিশোধে ৪৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি খাতে ৭৬ কোটি টাকা, কল্যাণমূলক খাতে ৩৯ কোটি টাকা এবং আতিথেয়তা ও উৎসব খাতে ৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

আয়ের প্রধান খাতসমূহ : প্রস্তাবিত বাজেটে নিজস্ব উৎস থেকে ১ হাজার ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা আয় ধরা হয়। গতবার নিজস্ব উৎসে আয় হয়েছে ৭৩৬ কোটি ২০ লাখ ৬৭ হাজার ৪০০ টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে নিজস্ব উৎসের অন্যান্য খাতগুলোর মধ্যে রাস্তা খননসহ ১২ ধরনের ফি থেকে ১৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা, জরিমানা খাতে ২ কোটি টাকা, ব্যাংক স্থিতি থেকে ৫০ কোটি টাকা এবং সম্পদ থেকে অর্জিত ভাড়াসহ আয় ধরা হয় ১০৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অন্যান্য উৎস থেকেও ৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ।

এছাড়া প্রকল্পের বিপরীতে উন্নয়ন অনুদান হিসেবে আয় ধরা হয় ৯৭৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এ খাতে ১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও আয় হয়েছে ৮৮৭ কোটি ৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এছাড়া ত্রাণ সাহায্য খাতে আরো ১০ কোটি টাকা আয়ের প্রস্তাব করা হয়। গতবারও ১০ কোটি টাকা আয় হয় এ খাতে।

যা বললেন মেয়র : বাজেট অধিবেশনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য সুনির্দিষ্ট চারটি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, চলমান নিয়োগ কার্যক্রম স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা, দক্ষ জনবল গড়ার লক্ষ্যে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমান কাজের পরিধি এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নতুন সাংগঠনিক কাঠামো প্রণয়ন এবং অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমসহ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমসমূহ ডিজিটালাইজেশন করার লক্ষ্যে এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি ৫৯৬ কোটি টাকা দেনা নিয়ে। বর্তমানে দেনার পরিমাণ কমে ৩৮০ কোটি টাকা হয়েছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে আমি ভালোবাসি। আপনারা আমাকে একটু সাহায্য করবেন, কর্পোরেশনের দেনা যত দ্রুত সম্ভব তা শূন্যের কোটায় নিয়ে আসব ইনশাআল্লাহ ।

তিনি বলেন, সড়ক অবকাঠামোর নকশাগত ধারণক্ষমতা যেখানে সর্বোচ্চ ১০ টন, সেখানে বন্দরের ভারী যানবাহন নিয়মিতভাবে ২০ থেকে ৩৫ টন পর্যন্ত অতিরিক্ত ওজন বহন করে চলাচল করছে। প্রায় প্রতিটি লরি অনুমোদিত সীমার তিন গুণেরও বেশি ওজন নিয়ে সড়ক ব্যবহার করছে, যা সড়কের স্বাভাবিক স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একটি সড়কের গড় আয়ুষ্কাল যেখানে স্বাভাবিকভাবে তিন থেকে পাঁচ বছর থাকার কথা, সেখানে অতিরিক্ত ওজন বহনকারী এসব যানবাহনের কারণে সড়ক দ্রুত ভেঙে পড়ছে। এর ফলে প্রতি বছর শুধুমাত্র সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে কর্পোরেশন।

শাহাদাত বলেন, নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাস্তা–নালা–ফুটপাথ দখলকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত আছে। ফলে দীর্ঘদিনের ফুটপাত দখলকারীদের উচ্ছেদের মাধ্যমে নগরবাসীকে চলাফেরার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য, ডেঙ্গু ও মশক নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সচেতনতার মেলবন্ধনে আমাদের এই চট্টগ্রামকে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি দৃষ্টিনন্দন, স্বাস্থ্যকর এবং আদর্শ বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা চাই।

২০২৬–২০২৭ অর্থবছরে নগরে ১০ লক্ষ গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; ব্যক্তি, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে এ কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

হকার সমস্যার সমাধানে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরে মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের হকার্স সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ফুটপাত দখল করে হকার ব্যবসা পরিচালনার ফলে নগরে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এই সমস্যা নিরসনে পরিকল্পিতভাবে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট স্থাপন করা হবে। হকার সমস্যা সমাধানে নগরের গুরুত্বপূর্ণ চারটি পয়েন্টে আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট গড়ে তোলার বিষয়ে চায়নার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। ইপিজেড, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট ও স্টেশন রোড এলাকায় এই ধরনের মার্কেট নির্মাণ করা যেতে পারে। এছাড়া চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের পাশে খালি জায়গায় হকারদের জন্য ভূমি বরাদ্দের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, নগরের সার্বিক উন্নয়নের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন‘ শীর্ষক প্রকল্পটির আওতায় ৩২৪টি উপ–প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার অধিক দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ৩১৫টি কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। প্রকল্পটির ১২৪টি লটের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। উক্ত প্রকল্পের আওতায় তিনটি ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, ২৫টির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে এয়ারপোর্ট রোডসহ শহরের অন্যান্য সড়কগুলো ফুটপাতসহ দৃষ্টিনন্দন সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির অধীনে নিয়োজিত কনসালটেন্টের মাধ্যমে কাজগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। ডা. শাহাদাত বলেন, বিগত বছরগুলোতে আমরা শুধু প্রথাগত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকিনি, বরং আধুনিক প্রযুক্তি এবং পরিকল্পিত উদ্যোগের সমন্বয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। নগরের প্রতিটি স্থানকে আবর্জনামুক্ত রাখা এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি, বিশেষ করে মশা ও ভেক্টরবাহিত রোগ প্রতিরোধে আমাদের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দিন–রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, বর্জ্যের সুষম রিসাইক্লিং এবং পরিচ্ছন্নতার এই ধারাকে আরো বেগবান করতে এবারের ২০২৬–২০২৭ সালের বাজেটে আমরা বেশ কিছু যুগান্তকারী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।