পায়রায় যুক্ত হচ্ছে আরো তিন বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে ভাড়াভিত্তিক, অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ এবং নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহের অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ।
এদিকে, পায়রা বন্দরে যুক্ত হচ্ছে কয়লা এলএনজির আরো তিন বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র। আওয়ামী লীগ তার ইশতেহারে জানায় যে, উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ মূল্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংস্থান একটি পূর্বশর্ত। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে বিদেশি শোষণ চিরতরে বন্ধ এবং জাতীয় স্বার্থকে সুরক্ষা দিতে দেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদসহ সব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রথম সরকারের সময় (১৯৯৬ থেকে ২০০১) জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের ব্যাপক লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার সরকারের তিন মেয়াদে দেশে যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক উন্নয়ন করা হয়। ফলে শিল্প ও বাণিজ্য খাত প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলসহ দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ প্রাপ্তি সুনিশ্চিত হয়েছে। ইশতেহারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নের অঙ্গীকারগুলো হলো— নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। পর্যায়ক্রমে ভাড়াভিত্তিক ও অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ (রিটায়ারমেন্ট) করা হবে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য গ্রিড যুগোপযোগী করা হবে। নেপাল ও ভুটান থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি এবং এই অঞ্চলে আন্তরাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাণিজ্য ত্বরান্বিত করা হবে এবং সঞ্চালন লাইনের পরিমাণ ২৪ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে উন্নীত করা হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ও পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
পটুয়াখালীর পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। সংস্থাটি এখন পায়রায় একই সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক আরেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। যৌথভাবে কয়লাভিত্তিক আরেকটি বিদ্যুৎ নির্মাণ করছে চীনা কোম্পানি নরিনকো ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল)। এটিরও সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। পায়রাতেই ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল)। এরই মধ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ২০২৫ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রেরই উৎপাদনক্ষম হয়ে ওঠার কথা রয়েছে। দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা এখন প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। যদিও দেশে এখন পর্যন্ত দৈনিক বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার উঠেছে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। পায়রার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নির্মাণ শেষ হলে দেশের গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের মোট উৎপাদন সক্ষমতায় যুক্ত হতে যাচ্ছে আরো ৩ হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু রাখতে হবে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কয়লা ও এলএনজি ব্যবহার করে। এতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আর্থিকভাবে আরো চাপে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটির কাছে এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুতের বিল বাবদ পাওনা বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে। জ্বালানি আমদানিতে অর্থ সংকটের কারণে চলতি বছরেই কয়েক দফায় বন্ধ রাখতে হয়েছে পায়রা, রামপালসহ বেসরকারি খাতের কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। আবার চাহিদা ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন শুরু করতে পারছে না গ্যাসভিত্তিক বড় তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
বিসিপিসিএল সূত্রে জানা গেছে, পায়রায় সংস্থাটির দ্বিতীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ ২১ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার প্রকল্পের এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অর্থায়ন করছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির আর্থিক কার্যক্রমের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কাজও জোরালোভাবে এগিয়ে চলছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট (৬৬০ মেগাওয়াট) ২০২৪ সালের মে মাসে এবং দ্বিতীয় ইউনিট একই বছরের জুনে উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। যদিও বিপিডিবি ২০২৪ সালের নভেম্বরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে দ্বিতীয় ইউনিটে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। নরিনকো ও আরপিসিএলের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে গৃহীত প্রকল্পের কাজ এরই মধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি মাস পর্যন্ত এর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ। আর আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আগামী বছরের জুন নাগাদ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ও অক্টোবর নাগাদ দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের বয়লার, চিমনি, পাওয়ার হাউজসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা আমদানির জাহাজ চলাচলের জন্য জেটি নির্মাণকাজ এবং কোল কনভেয়ার বেল্ট ও সঞ্চালন টাওয়ার কাজ নির্মাণাধীন রয়েছে। আরপিসিএল-নরিনকোর যৌথ বিনিয়োগে নির্মীয়মাণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ব্যয় হচ্ছে আড়াই বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৭০ শতাংশের অর্থায়ন হচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের মাধ্যমে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে আরপিসিএল-নরিনকোর যৌথ মালিকানায় গঠিত কোম্পানি আরএনপিএল।

দেশে এলএনজি আমদানি বাড়ার সম্ভাবনা থেকে পায়রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বড় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে এনডব্লিউপিজিসিএল। এরই মধ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। আগামী ২০২৭ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বিপিডিবি।
দেশে চলতি বছরেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের বৃহৎ সক্ষমতার কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এরই মধ্যে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে জাপানি অর্থায়নে নির্মিত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বেসরকারিভাবে নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎও এখন গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। এর বাইরে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে সামিট, ইউনিক ও রিলায়েন্স গ্রুপের গ্যাসভিত্তিক বড় তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র।