রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলো যেন অনিয়ম আর অরাজকতার আরেক নাম। যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা আর প্রধান প্রধান সড়ক দখল করে পার্কিং করায় বাড়ছে যানজট ও ভোগান্তি। নগরবাসীর দাবি, দ্রুত টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে নেওয়ার। দুর্ভোগ কমাতে সরকার টার্মিনাল সরানোর পরিকল্পনা করলেও বিশেষজ্ঞরা এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান।
রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল: টার্মিনালের ভেতর বিশাল জায়গা রেখে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে মহাখালী পর্যন্ত প্রধান সড়কে পার্কিং করা হয় শত শত বাস। কাউন্টার থেকে যাত্রী না তুলে রাস্তা থেকেই যাত্রী ওঠানামার প্রতিযোগিতাও চলে। ফলাফল বনানী থেকে বিমানবন্দর মহাসড়ক যানজটে স্থবির এবং লাখো যাত্রীর তীব্র ভোগান্তি।
অনিয়ম ঠেকাতে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ ও কমিউনিটি পুলিশের তৎপরতা থাকলেও তা থোড়াই কেয়ার করেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।
কাউন্টার ভেতরে রেখে বাইরে থেকে কেন যাত্রী তুলছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বাসচালক ও হেলপাররা জানান, মনে করেন আমগো গাড়িগুলা বাইরে যাত্রী উঠায়, বুঝছেন? টুকটাক ওই জায়গায় শৌখিন খাড়াইয়া রইছে। আমি একদম জ্যামে আছি, বুঝেন নাই? পকেট রাস্তা বন্ধ, তাই উঠাইয়া লইলাম ভাই। গাড়ি নিয়ে আইসা পড়ছি, ক্লিয়ার হইছে, টান দেওয়া পড়ছি। দেখেন, ১০টা মিনিট দাঁড়াইয়া কিরম জ্যাম বাইর করতে হয়, যানজট ছাড়াইতে হয়।
ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক ওমর ফারুক জানান, কিছু অপরাধ হয়। হয়তোবা একটা যাত্রী উঠবে, বা বৃদ্ধ মহিলা উঠবে, বা রোগী উঠবে; ওই ক্ষেত্রে আমরা একটু এক্সকিউজ করি। আদারওয়াইজ আমরা গাড়িগুলো ধরে রেখে প্রসিকিউশন দিই। তারপরে যদি এমন হয় গাড়ি রেখে ড্রাইভার চলে গেছে, ড্রাইভারকে খুঁজে পেলাম না, সেই ক্ষেত্রে আমরা রেকারের মাধ্যমে সেটি ডাম্পিং স্টেশনে পাঠিয়ে দিই।
ঢাকার সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তান। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল ঘিরে রাতদিন বাস মালিক-শ্রমিকদের অরাজকতা। গোলাপশাহ মাজার থেকে শুরু করে বংশাল হয়ে তাঁতীবাজার পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশেই পার্কিং করে রাখা হয় বাস। একে তো টার্মিনালের ভেতরে জায়গা কম, তার ওপর কোনো বাস কোম্পানির নিজস্ব পার্কিং নেই। ইচ্ছামতো যাত্রী ওঠানামার কারণে নাজেহাল মানুষ।
গাড়িচালক এবং যাত্রীরা জানান, গাড়ি রানিংয়ে থাকে, তার ওপর যাত্রীরে তাড়াতাড়ি করে উঠাইতে হয়। সার্জেন্টে ধরে, বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয়। গুলিস্তানের থেকে যদি পরিবহন বাইর কইরা দেয়, তাহলে যানজট কমে যাইব। প্রত্যেক কোম্পানির লাইনম্যান থাকে, ও লাইনম্যানরা মিলা-জুলা রাস্তাটা ক্লিয়ার করে ফেলে। এখানে এই কাউন্টারগুলা কখনো সরানো হয় নাই। আজকে যেরকম অবস্থা দেখতেছেন, কালকে আইসাও এই অবস্থায় দেখবেন। আমাদের একটা নির্দিষ্ট জায়গা চাই, যেখানে আমরা নির্দিষ্টভাবে গাড়ি পার্কিং করতে পারি এবং নির্দিষ্ট জায়গা থেকে যাত্রী নিতে পারি।
টার্মিনাল ঘিরে সমস্যা সমাধানে এগুলো সরানোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, যাত্রাবাড়ী থেকে আমরা কাঁচপুর ব্রিজের পাশে এবং ফুলবাড়িয়ারটাকে আমরা কেরানীগঞ্জ, আর গাবতলীকে হেমায়েতপুর আর মহাখালীটাকে আমরা পূর্বাচলে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিচ্ছি। এগুলিকে স্থায়ী করার জন্য ওইসব জায়গায় আবার কিছু জমি অ্যাকোয়ার করা হচ্ছে, আবার কিছু জায়গায় আমাদের সরকারি কিছু জমি রয়েছে, সেগুলিকে উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে।
সরকারের এমন সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি টার্মিনাল সরানোও যায়, তখনও দরকার হবে আধুনিক ব্যবস্থাপনার।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, টার্মিনালগুলিকে আপনি চালু করেন। শহরের মধ্যে যে টার্মিনালগুলি আছে, টিকিট কাউন্টারগুলি যদি সুশৃঙ্খল করা যায়, তাহলে যাত্রীরা টার্মিনাল থেকে উঠবে। তাহলে হবে কি, এটা একটা টেকসই সমাধান হবে। কারণ আমরা পুরো টার্মিনাল যদি সরিয়ে নিয়ে যাই, তাহলে হবে কি শহরতলিতে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার পর এই যাত্রীরা শহরতলি থেকে যে শহরের মধ্যে ঢুকবে, এই কানেক্টিভিটি বা আন্তঃসংযোগ এটাও কিন্তু একটা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ শহরের মধ্যেই তো বাস আমরা ঠিক করতে পারিনি।
২০২১ সালে প্রথম ঢাকার টার্মিনালগুলো নগরীর বাইরে নেওয়ার উদ্যোগ নেন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। কিন্তু এতদিনেও এর শিকিভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। এখন বর্তমান সরকার এ নিয়ে কী সমাধান দেয়, সেটিই দেখার বিষয়।