ইরানের রাজধানী তেহরানে কোটি কোটি মানুষের সমাগমে চলছে শ্রদ্ধা আর প্রতিশোধের অঙ্গীকারে ঘেরা এক ঐতিহাসিক বিদায়পর্ব। তেহরানের গ্র্যান্ড ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুরু হতেই সেখানে নেমে আসে শোকাহত মানুষের ঢল। ভোর হওয়ার অনেক আগেই ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে জড়ো হতে থাকেন বিশাল এই ধর্মীয় কমপ্লেক্সে।
পরিবার-পরিজন, আলেম-ওলামা, শিক্ষার্থী, ধর্মীয় নেতা এবং ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ তথা নারী থেকে প্রবীণ-সবার গন্তব্য ছিল একটাই। অনেকের হাতে ছিল ইরানের পতাকা, আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতিকৃতি, পবিত্র কোরআন এবং কালো শোকের পতাকা। তাদের কাছে এটি শুধু একজন রাষ্ট্রনেতার জানাজা নয়; বরং এমন এক নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর মুহূর্ত, যাকে তারা ইসলামী বিপ্লবের রক্ষক এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
শোকানুষ্ঠান ঘিরে পুরো তেহরান যেন কালো শোকে ঢেকে যায়। সরকারি ভবন, মসজিদ ও জনসমাগমস্থলে উড়তে থাকে কালো পতাকা। রাজধানীর বড় বড় সড়কে টানানো ব্যানারে আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদাতের কথা তুলে ধরা হয় এবং ইরানের সমকালীন ইতিহাসে তার অবদানের প্রশংসা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে লাউডস্পিকারে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াত, শোকসংগীত ও বিপ্লবী সঙ্গীত সম্প্রচার করা হচ্ছিল, যা পুরো নগরীতে এক গভীর শোকাবহ আবহ তৈরি করে।
মোসাল্লার ভেতরে ও বাইরে শোকাহত মানুষের হাতে ছিল লাল পতাকা-যা শহীদদের রক্তের প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। জনতার কণ্ঠে উঠতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান। ‘ডেথ টু আমেরিকা’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’- এমন স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে শোকমঞ্চের চারপাশ। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, কিন্তু সেই শোকের মধ্যেই স্পষ্ট ছিল প্রতিশোধের আগুন।
মূল নামাজকক্ষে কাচঘেরা একটি স্থানে রাখা হয় আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় নিহত তার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের মরদেহ। শোকাহত মানুষ একে একে সেখানে গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান। কেউ নীরবে দোয়া করেন, কেউ কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করেন, আবার কেউ অশ্রুসজল চোখে দাঁড়িয়ে থাকেন দীর্ঘক্ষণ।
ঘোষণা অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রোববার পর্যন্ত গ্র্যান্ড ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। এরপর সোমবার তেহরানে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক শেষযাত্রা। তার পাশে রাখা হয়েছে নিহত স্বজনদের মরদেহও-যাদের মধ্যে রয়েছেন তার জামাতা ড. মেসবাহ আল-হোদা বাঘেরি কানী, বড় মেয়ে সাইয়্যেদেহ বশরা হোসেইনি খামেনি, ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানি এবং পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল।
ইরানের লাখো মানুষের কাছে এই শোকানুষ্ঠান কেবল একজন শাসককে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি এমন এক নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, যাকে তারা বিশ্বাস করেন সারাজীবন ইরানের স্বাধীনতা, ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ এবং মুসলিম বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সংগ্রাম করা এক মহান ও বিপ্লবি নেতা হিসেবে। তাদের বিশ্বাস, আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদাত তার প্রভাবের সমাপ্তি নয়; বরং তার উত্তরাধিকারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ইরানের সীমানা ছাড়িয়েও খামেনি প্রভাব ছিল বিস্তৃত। মুসলিম বিশ্বের অনেকের কাছে তিনি ছিলেন বিদেশি আধিপত্যবিরোধী প্রতিরোধের এক জোরালো কণ্ঠস্বর। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, ‘প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব তখনই, যখন জাতিগুলো নিজেদের মানুষ, নিজেদের জ্ঞান, নিজেদের সংস্কৃতি ও নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখবে।’
এই কারণেই তেহরানের শোকমঞ্চে জমায়েত হওয়া কোটি মানুষের চোখে অশ্রু থাকলেও, সেই অশ্রুর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আরেকটি অঙ্গীকার-তাদের বিশ্বাসের নেতা চলে গেলেও তার দেখানো পথ, তার প্রতিরোধের ভাষা এবং তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার তারা বয়ে নিয়ে যাবে আগামী প্রজন্মের কাছে।