দুই বছর আগে জুলাইয়ের আন্দোলন শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। সেই প্রত্যাশার অংশ হিসেবে গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন—এ বিতর্কে মুখোমুখি সরকার ও বিরোধী দল। এই মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট।দাবি আদায়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। বিরোধ তৈরি না করে সংবিধান থেকে ফ্যাসিবাদী কাঠামো চিরতরে দূর করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জুলাই ক্যালেন্ডারের পাতায় শুধু একটি শব্দ নয়। এর মাঝে লুকিয়ে আছে রক্তাক্ত সংগ্রাম। আছে অজস্র মানুষের কান্না, বুকফাটা আর্তনাদ এবং দিনবদলের নতুন সূর্য দেখার অপেক্ষা।দুই বছর আগে এই সময়ে রাজপথে নেমেছিল লাখো মানুষ। উত্তাল ছিল পুরো দেশ। কোটা সংস্কারের আন্দোলন রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে। বুলেটের সামনে বুক পেতে দেয় ছাত্র-জনতা।
সংসদে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘যে পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, ঠিক একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদেরও সভা আহ্বান করা হবে।’
অপরদিকে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সংবিধান পরিবর্তন হবে—এ রকম কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না।’
সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে গেল সংসদ নির্বাচনে গণভোট হলেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। সরকার সংবিধান সংশোধন চাইলেও বিরোধী দল চায় সংবিধান সংস্কার। সরকারের বিশেষ সংস্কার কমিটির আহ্বানেও সাড়া দেয়নি বিরোধী দল। এ অবস্থায় আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ডেপুটি স্পিকার।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে সমন্বয় হবে। সেই ঘোষণা ইতোমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। তবে কমিটিতে কারা থাকবেন, কারা থাকবেন না—সেটি পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেই নির্ধারণ করা হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তারা আলোচনার ভিত্তিতেই একটি সুন্দর সমাধানে পৌঁছাবেন, যা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে এবং জাতির প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’
জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে ভুল পথে হাঁটছে বিএনপি। সরকার এককভাবে সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা করলে তীব্র আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন দলটির নেতারা।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘পার্লামেন্টের মাধ্যমে যদি সংস্কার হয়ে যায়, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ—প্রায় ৭০ শতাংশ—যা চেয়েছে, সেটি আদায়ে আমরা আবারও দেশে পরিবর্তন আনব। বিএনপি যে পথে হাঁটছে, সেটা একেবারেই ভুল পথ। এর চেয়েও মারাত্মক বিষয় হলো, এটি একটি অগণতান্ত্রিক পথ।’
গণভোটের পরও এমন সংকটে উদ্বিগ্ন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সংস্কার বা সংশোধন ইস্যুতে বিরোধ সৃষ্টি না করে সংবিধান থেকে ফ্যাসিবাদী কাঠামো চিরতরে দূর করার তাগিদ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকার এবং বিরোধী দল—উভয়ই সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার নিয়ে আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু শুধু এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করে জাতির কোনো লাভ নেই। জাতির প্রকৃত লাভ হবে সংবিধান থেকে সেই উপাদানগুলো দূর করার মাধ্যমে, যেগুলো কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।’আলোচনার মাধ্যমেই গণতন্ত্রের টেকসই উন্নয়নের আশা দেখছেন এই বিশ্লেষক।
জুলাইয়ের আত্মত্যাগ শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের এক অপূর্ণ অঙ্গীকার। কিন্তু জুলাইয়ের সেই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো মতবিরোধ রয়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে—যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজপথে নেমেছিল, সেই স্বপ্ন কি বাস্তবে রূপ পাবে? নাকি রাজনৈতিক মতবিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে হারিয়ে যাবে জুলাইয়ের সেই অঙ্গীকার?