চট্টগ্রাম নগরে জল জমছে তবে বৃষ্টি বিরতি দিলে দ্রæত সময়ে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে শনিবার দুপুর অব্দি জলাবদ্ধ জনসাধারণের ভোগান্তি অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া গেছে। টানা কয়েকদিন পর শনিবার দুপুরে রোদের দেখা মিলেছে। ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন জেলা উপজেলায় সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কর্মসূচির আওতায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আইএসপিআর জানায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর এই কার্যক্রম চলবে। শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার রশিদের পুকুর এলাকায় বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগের শুরু থেকেই চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ রাখছেন। এছাড়া বন্যাদুর্গতদের সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন।
শুক্রবার (১০ জুলাই) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা জেলার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব এলাকায় ১০ পদাতিক ডিভিশনের উদ্ধারকারী দল মোতায়েন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলাতেও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাসদস্যরা আটকে পড়া মানুষের উদ্ধার এবং ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দ্রæত ও সমন্বিতভাবে অভিযান চালানোর জন্য বন্যাকবলিত এলাকায় তিনটি অস্থায়ী ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়েছে।
বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন :
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দুধপুকুরিয়া-পদুয়া এলাকায় টানা ভারী বর্ষণ ও বন্যার পানির প্রবল স্রোতে স্থানীয় একটি সেতু ধসে পড়েছে। গতকাল শনিবার (১১ জুলাই) সকালে এ ঘটনা ঘটে। বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেতুটি ভেঙ্গে পড়ার কারণে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কপথে যান চলাচল বন্ধ হয়ে আছে। স্থানীয়রা জানান, দুধপুকুরিয়া-পদুয়া এলাকার সেতুটি ধসে পড়ায় ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দু’ পাশের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রæত বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা ও নতুন সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং দ্রæত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তারা জানান।
পানি কমেছে- দূর্ভোগ কমেনি : জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য মতে, গত শুক্রবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১৭৬টি ইউনিয়নের ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে আছে সাতকানিয়ার জনগন। এছাড়া বাঁশখালী ও চন্দনাইশে পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এসব এলাকার লাখো মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। অনেক বাড়িতে রান্নার সংকটে লোকজন শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি সচল না হওয়ায় জরুরি সেবা নিশ্চিত করা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাতকানিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে। চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসীর যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ, থানা চত্বর, আদালত ও পৌরসভা কার্যালয়েও বন্যার পানি রয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও কাটেনি বলে জানা যায়। সাতকানিয়ার চরতি ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. এফতেখারুল ইসলাম রাসেল বলেন, চার দিন যাবত ঘরে পানি। রান্না করা যাচ্ছেনা। অনেক বাড়িতে শুকনো খাবার শেষ হয়ে বিপত্তি বেড়ে আরো বেড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে শিশুদের শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ লোকজনের সমস্যাও বেশি হচ্ছে। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন বিশ্বাস বলেন, পানি কিছুটা কমলেও অনেক এলাকায় মানুষ এখনো পানিবন্দি। আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্গত এলাকায় নিয়মিত ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
বাঁশখালীর ছনুয়া, পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, সরল, কাহারঘোনাসহ পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় শনিবারও পানি নামেনি বলে জানা গেছে। সাগরের জোয়ার ও পাহাড়ি ঢলে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন বাড়ি থেকে পানি না নামায় রান্নার চুলাও জ্বালানো যাচ্ছে না। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রায় চার হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও দেড় হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও ত্রাণ বিতরণ করছে। তবে এসব সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলে জানান ক্ষতিগ্রস্তরা।
চন্দনাইশেও দুই পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চলে শনিবারও পানি নামেনি বলে জানা গেছে। এসব এলাকার প্রায় প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর আউশ ধান, ৯০০ হেক্টর বিভিন্ন সবজি ও ৭০ হেক্টর পেঁপে ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পাঁচ শতাধিক পুকুর ও মাছের প্রজেক্ট ডুবে মাছ ভেসে যায়। এতে কমপক্ষে ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিঘিœত হচ্ছে।
মিরসরাইয়েও অধিকাংশ এলাকার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। এখানেও বিদ্যুত ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা জনভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষেরা। এছাড়া এখানে পানিতে ডুবে রয়েছে আউশ রোপা ও আমন বীজতলা। স্থানীয় কৃষক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘আউশের রোপা এখনো পানির নিচে। ১০ শতক জমিতে আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলাম, পাহাড়ি ঢলের স্রোতে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি কমলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে।’ স্থানীয়রা জানান, মিরসরাইয়ে পাহাড়ি ছরা বা ছোট ছোট খাল রয়েছে। এসব দখল হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি ঢল আটকে রাস্তা-ঘাট ভেঙে পানি মানুষের জমিতে ঢুকে যাচ্ছে।’
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রæত ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। যেসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত, সেখানে বিকল্প উপায়ে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।