উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির প্রভাবে গাইবান্ধার নদ-নদীর পানি ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। যদিও বেশিরভাগ নদীর পানি কিছুটা কমেছে, তবে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এদিকে পানির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধায় ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় জেলার অধিকাংশ নদীর পানি কমলেও করতোয়া নদীর পানি ১১৬ সেন্টিমিটার বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত জেলার সব নদীর পানিই বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাতটি উপজেলায় মোট ১১৮ হেক্টর জমির আউশ, পাট, তিল, আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির ফসল পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে।
বুধবার (১ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে পানি কিছুটা কমলেও নদীভাঙন বেড়েছে। অনেক স্থানে ফসলি জমি ও পাটক্ষেত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে জেলা প্রশাসক মো. মাসুদুর রহমান মোল্লা ফুলছড়ি উপজেলার ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন।
এদিকে সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ২০০ মিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ ধসে গেছে। এতে কয়েকটি গ্রাম নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে তারা চরম দুর্ভোগে আছেন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর, রসুলপুর ও উড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গত এক সপ্তাহে শতাধিক বিঘা জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। একইভাবে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ও হরিপুর ইউনিয়নেও তীব্র ভাঙনে শতাধিক বসতভিটা, আবাদি জমি ও গ্রামীণ সড়ক বিলীন হয়েছে। বর্তমানে আরও অনেক বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পুরোনো বেড়িবাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফ্ফাত জাহান তুলি জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সহায়তা বিতরণ করা হবে।
সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল কবীর বলেন, নদীভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম জানান, গত এক মাসে নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের ১১৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচে থাকলেও সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার অন্তত ২৫টি পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে কাজ চলছে।
জেলা প্রশাসক মো. মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা অনুযায়ী সরকারি সহায়তা প্রদান অব্যাহত থাকবে।