বঙ্গবন্ধু টানেলের ৯৯.৫ শতাংশ কাজ শেষ, উদ্বোধনের অপেক্ষা
আনোয়ারাকে নিয়ে চট্টগ্রাম হবে ‘এক নগরী দুই শহর’
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণ কাজ বর্তমানে ৯৯.৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এখন টানেলের বৈদ্যুতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। চলতি মাসে এসব কাজ শেষ হলে টানেলটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকবে বলে দৈনিক দেশ বর্তমানকে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশিদ।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ টানেল উদ্বোধন করবেন। গত ২৬ এপ্রিল সেতু বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এক সভায় তিনি এ বার্তা দেন।
চট্টগ্রামবাসী অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন চার লেনবিশিষ্ট দেশের প্রথম এই টানেল চালু হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণের।
বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘টানেলের ৯৯.৫ শতাংশ কাজ শেষ। এখন শেষ পর্যায়ে ইলেকট্রিক্যাল কাজ এবং সিকিউরিটির বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আশা করছি, চলতি মাসের মধ্যে টানেলের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। এরপর আমরা উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকবো।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘টানেলটি ইতোমধ্যে গাড়ি চলাচলের উপযোগী হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকর্তারা কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিনই টানেলের পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে আনোয়ারা প্রান্তে যাতায়াত করছেন।’
বাংলাদেশ ও চীন সরকারের যৌথ অর্থায়নে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু টানেল। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। বাকি অর্থ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এই প্রকল্পের ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে ‘চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
টানেলটি পশ্চিম প্রান্তে পতেঙ্গা নেভাল একাডেমির নিকট হতে শুরু হয়ে পূর্ব প্রান্তে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা (সিইউএফএল) এবং কর্ণফুলী সার কারখানার (কাফকো) মাঝখান দিয়ে আনোয়ারা প্রান্তে পৌঁছেছে। নদীর তলদেশে টানেলের মূল পথের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। সর্বনিম্ন ৩৬ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ১০৮ ফুট গভীরে স্থাপন করা হয়েছে দুটি সুড়ঙ্গ। প্রতিটি সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। প্রতিটি ৩৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট উচ্চতার। ১১ মিটার ব্যবধানে নির্মিত দুই সুড়ঙ্গে দুটি করে মোট চারটি লেন রয়েছে। এই টানেল দিয়ে যানবাহন ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারবে।
মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম প্রান্তে (পতেঙ্গা) ০.৫৫০ কিমি ও পূর্ব প্রান্তে (আনোয়ারা) ৪.৮ কিমিসহ মোট ৫.৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক রয়েছে। এ ছাড়াও আনোয়ারা প্রান্তে সংযোগ সড়কের সঙ্গে ৭২৭ মিটার উড়াল সড়ক রয়েছে।
নিরাপদে গাড়ি চলাচলের জন্য টানেলের উভয় প্রান্তে স্ক্যানার বসানো হয়েছে। এরই মধ্যে টানেলের ভেতর গাড়ি চলাচলে টোল চূড়ান্ত হয়েছে।
টানেলে দিনে প্রায় ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি চলতে পারবে।
২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যৌথভাবে বঙ্গবন্ধু টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম টানেল সুড়ঙ্গ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধু টানেল যোগ করবে নতুন মাত্রা। টানেলটি প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়েকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করবে এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার কমিয়ে দেবে। এই টানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে কর্ণফুলীর দুই তীরে গড়ে উঠবে ‘এক নগর, দুই শহর’। এ রকম নগরীর দেখা মেলে চীনের সাংহাইয়ে। দেশটির সবচেয়ে বড় ও জনবহুল নগরী সাংহাই পরিচিত ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে। সাংহাই নগরীর মতো চট্টগ্রাম নগরী থেকে আনোয়ারা উপজেলাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে কর্ণফুলী নদী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গবন্ধু টানেলের কাজ যত এগিয়েছে ততই স্থাপিত হচ্ছে নতুন নতুন শিল্প কারখানা। গত চার বছরে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে গার্মেন্টস, জাহাজ নির্মাণ, ভোজ্য তেল, মাছ প্রক্রিয়াকরণ, ইস্পাত, সিমেন্টসহ অন্তত ৮০টি শিল্প কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনও শুরু করেছে।
অনেক বড় বড় শিল্প গ্রুপ ইতিমধ্যেই কারখানা গড়ে তোলার চিন্তা থেকে কিনে রেখেছেন আগাম জমি। সবমিলিয়ে বঙ্গবন্ধু টানেল বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ল্যান্ডস্কেপে আনছে বড় ধরনের পরিবর্তন। দক্ষিণ চট্টগ্রাম হয়ে উঠছে দেশের নতুন বিজনেস হাব।
এমএফ