বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর পাশাপাশি জেলা শহরগেুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকার বাইরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছে। গত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে পাঁচগুণ। এবছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি অন্যান্য সময়ের তুলনায় ভয়াবহ হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ২৯ মে’ পর্যন্ত পাঁচ মাসে ১ হাজার ৭০৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত পাঁচ বছরে শনাক্ত ও মৃত্যুর এমন চিত্র আর দেখা যায়নি। গত বছর প্রথম পাঁচ মাসে শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৩৫২ জন। এ সময়ে কারও মৃত্যু হয়নি। সে তুলনায় চলতি বছর (পাঁচ মাসে) শনাক্ত বেড়েছে ৩৬০ শতাংশ।
বাংলাদেশে সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয় বর্ষাকালে। জুন থেকে প্রকোপ চলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বর্তমানে ডেঙ্গুর সঙ্গে বৃষ্টির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহতার জন্য নগরবাসীর সচেতনতা ও ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের ব্যর্থতাকে দূষছেন কীটতত্ত¡বিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণহীন। তারা মনে করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশা নিধন কর্মসূচি সারা বছর অব্যাহতভাবে রাখতে হবে। জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগাক্রান্তদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বেশিরভাগ রোগী জটিল পরিস্থিতি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে হাসপাতালে ভর্তির তিন দিনের মধ্যে কারও কারও মৃত্যু হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেওয়া ৭২২ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি রোগী রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার। গত বছর সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গিয়েছিল মুগদায়। যাত্রাবাড়ীর পরই কেরানীগঞ্জ ও কাজলা, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মুগদা ও জুরাইন রয়েছে।
এ বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের ৬১ দশমিক ৮ শতাংশই ঢাকা দক্ষিণ সিটির। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) আক্রান্তের হার ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। রাজধানীর বাইরে রয়েছে শনাক্তের হার ২১ দশমিক ৯ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ ও ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ নারী।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পওয়া তথ্য অনুযায়ী গতকাল সোমবার ২৪ ঘন্টায় দেশে নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে ৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৮ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪ জন। তবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে কারো মৃত্যু হয়নি।
এতে বলা হয়, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ২২৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। ঢাকার ৫৩টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ১৯৮ জন এবং অন্যান্য বিভাগে ২৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
ডেঙ্গু মৌসুমের আগেই গত বছরের তুলনায় এবার দেশে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা পাঁচগুণ বেড়েছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আমাদের অধিদপ্তর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জানুয়ারি থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ১ হাজার ৭০৪ জন ডেঙ্গুরোগী পেয়েছি। এসময়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আমরা যদি গত বছরের তুলনা করি, এবছর রোগীর সংখ্যা প্রায় পাঁচগুণ বেড়েছে।
ডেঙ্গুরোধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে দাবি করে মন্ত্রী বলেন, আমাদের হাসপাতালের পরিচালকদের সঙ্গে ডিজির (স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক) বৈঠক হয়েছে, হাসপাতালে যেন প্রস্তুতি থাকে। আমাদের ডাক্তার-নার্সদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাসপাতালে যেহেতু রোগী বাড়ছে, সেহেতু এ বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড এবং আলাদা কর্নার তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণকে সচেতন করার জন্য আমরা বিভিন্ন মহলকে যুক্ত করেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আছেন, ছাত্রছাত্রী আছেন, তাদের মাধ্যমে এটা প্রচার করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও যুক্ত করা হয়েছে, যারা জনগণকে সতর্ক করতে পারে, কীভাবে ডেঙ্গুরোগ থেকে বাঁচা যায়, মশার কামড় থেকে বাঁচা যায় এবং ডেঙ্গু হলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা নেওয়া, এ বিষয়েও বলা।
এ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণার জন্য পোস্টার, ব্যানার এবং টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিয়ে জাহিদ মালেক বলেন, আপনাদের মাধ্যমে আমরা জনগণকে অবহিত করতে চাই যে, আপনারা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিন। মানে বাসার আশপাশের আঙিনা পরিষ্কার রাখুন, নিজের ঘর স্প্রে করুন, আশপাশে যদি জঙ্গল থাকে সেখানে স্প্রে করুন এবং পানি বা যদি অন্যকিছু জমে থাকে সেগুলো সরিয়ে ফেলুন। এ কাজগুলো আমাদের নিজেদেরই করতে হবে। কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে এসে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা নেবেন। সময়মতো চিকিৎসা নিলে প্রায় সবাই ভালো হয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, নির্মাণাধীন প্রায় শতভাগ ভবনে মশার লার্ভা পাওয়া যায়। তাই সেসব ভবন ও স্থাপনায় যেন এডিসের প্রজননস্থল সৃষ্টি না হয়, সে জন্য সবার যথাযথ তদারকি প্রয়োজন। নিজেরা এডিসের প্রজননস্থল নির্মূল না করতে পারলে, সিটি করপোরেশনকে জানাতে হবে। ডেঙ্গু থেকে ঢাকাবাসীকে সুরক্ষা দিতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।