জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশ যেন ছিল উত্তাল জনসমুদ্র। উত্তাল ঢেউ তুলেছিল অকুতোভয় বিপ্লবীদের মৃত্যুঞ্জয়ী সব স্লোগান। ৩৬ জুলাই পর্যন্ত যে দিনলিপি, তাতে প্রতিমুহূর্তে স্বৈরাচারের নৃশংসতার মাত্রা ছাড়িয়েছে। তখন পরিস্থিতি বিবেচনায় স্লোগানের ভাষা বদলেছে, এসেছে চূড়ান্ত বিজয়।
এই স্লোগানেই লুকিয়ে ছিল বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন, কোন পথে হাঁটবে আগামীর বাংলাদেশ? যার মর্মার্থ ধরতে পারেনি ১৭ বছর ধরে অবৈধভাবে চেপে থাকা ফ্যাসিস্ট শাসক। ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই, সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ সম্বোধন করলে বদলে যায় স্লোগানের ভাষা।
এরপরই বারুদ হয়ে ওঠে স্লোগান। ক্ষুরধার অস্ত্রের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়। তাতে স্বৈরাচারের ক্রোধ আরও বাড়ে। নিরস্ত্র স্লোগানকারীদের দিকে ধেয়ে আসে বুলেট। ১৬ জুলাই আবু সাঈদসহ ৬ জন শহীদ হন। নতুন স্লোগানের জন্ম হয়—‘ক্ষমতা না জনতা, জনতা জনতা।’
এর পরের প্রতিটি মুহূর্তে বেড়েছে সরকারের হত্যা-নির্যাতন। তখন আন্দোলনের গতিপথের সঙ্গে বদলেছে স্লোগানের ভাষাও।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, যখন দেয়ালে একেবারে পিঠ ঠেকে গেল, তখন রুখে দাঁড়াল ছাত্র-জনতা। রব উঠল—‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’
এ বিষয়ে জুলাই আন্দোলনকারী আলী আহসান জুনায়েদ বলেন, ১৬ তারিখ থেকে মূলত হাসিনাবিরোধী স্লোগানগুলো আরও বেশি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। যখন হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দেয়া হয়, তখন স্লোগানগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আরেক জুলাই আন্দোলনকারী শাকিল হোসেন সাদ্দাম বলেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে সাজানো সেরকম নয়। এটা আসলে অনস্পট; সে সময় রাজপথের আন্দোলনে যা ঘটে, স্লোগানগুলোও মূলত সেখান থেকেই উঠে আসে।
ফ্যাসিস্টকে সাফ জানিয়ে দেয়া হলো, ‘গুলি করে লাভ নেই, শোন মহাজন, আমরা কিন্তু অনেকজন।’ কথাগুলোতে মিশে ছিল বিপ্লবের তেজ। ‘বিকল্প কে? আমি, তুমি, আমরা।’
জুলাই আন্দোলনকারী আল ইমরান বলেন, আন্দোলন অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগানও বের হচ্ছে, পরিবর্তন হচ্ছে। আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্লোগানগুলো দিয়ে আমরা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও একটি স্লোগান আমাদের পছন্দ হয়েছে, আমরা সেটি পিক করেছি। পিক করে সেটি আমরা রাস্তায় ইমপ্লিমেন্ট করেছি।
বুক চিতিয়ে স্লোগান দিতে দিতেই রাজপথে ঢলে পড়ল ১,৪০০ প্রাণ, আহত হাজারে হাজার। দীর্ঘ হলো জুলাই মাস। সব শোককে শক্তি করে দেয়া হলো চূড়ান্ত ১ দফা।
৫ আগস্ট পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। ৩৬ দিনের এই আন্দোলনে এভাবেই অর্জিত হলো চূড়ান্ত বিজয়। তাই জুলাইয়ের স্লোগান শুধু আবেগে উচ্চারিত কোটি প্রাণের ধ্বনি নয়। এটি চরম নৃশংসতা আর ছাত্র-জনতার নিরস্ত্র প্রতিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।