বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ, পুনর্বাসনে জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। বুধবার (১৫ জুলাই) তিনি বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং দুই হাজারের বেশি বন্যাদুর্গত পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। এ সময় তিনি বলেন, বন্যা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

দুপুরে প্রথমে মন্ত্রী বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পালোয়ানপাড়া এলাকায় চলমান খাল খনন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পরে ইউনিয়নের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬৫০টি পরিবারের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

ত্রাণ প্যাকেটে ছিল ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি চিনি, ১ লিটার ভোজ্যতেল, ৫০০ গ্রাম চিড়া, ১ কেজি লবণ, পাঁচটি স্যালাইন, এক প্যাকেট বিস্কুট, দুটি সাবান ও ৫০০ গ্রাম মুড়ি।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. কামরুজ্জামান, উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

এরপর ত্রাণমন্ত্রী সাতকানিয়া উপজেলার বন্যাকবলিত এওচিয়া ও ধর্মপুর এলাকায় যান। এওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদে ৬০০ জন এবং ধর্মপুর বিশ্বের হাট এলাকায় ৮০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

সাতকানিয়ায় বিতরণ করা প্রতিটি ত্রাণ প্যাকেটে ছিল ১০ কেজি চাল, ৫ কেজি বিস্কুট, আধা লিটার তেল, ১ কেজি লবণ, ২ কেজি আলু, এক প্যাকেট মরিচ গুঁড়া, এক পাতা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং ২ লিটার নিরাপদ খাবার পানি।

ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, “গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রবল বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের পাশে রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বয়ে ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা মোকাবিলায় চট্টগ্রাম জেলায় এ পর্যন্ত ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে এবং ১৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দের মধ্যে ১ হাজার ৪০ মেট্রিক টন বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১৬০ মেট্রিক টন চাল মজুদ রয়েছে। জরুরি পুনর্বাসনের জন্য ৪৫ বান্ডিল ঢেউটিনও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) ১ হাজার প্যাকেট বিস্কুট, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং জাগরণী চক্র ৫০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করেছে। এছাড়া সংস্থাটি আরও ১ হাজার ৫০০ প্যাকেট বিতরণের প্রস্তুতি নিয়েছে। চিটাগাং উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিও বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় ২ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে।

বন্যায় প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে ৩৯টি গরু, ৯৫টি ছাগল, ৪২টি ভেড়া, ১ লাখ ৪২ হাজার ১৩৭টি মুরগি এবং ১ হাজার ৩০০টি হাঁস মারা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ২৯৮টি গবাদিপশুর খামার, যার আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ১২ কোটি ৬৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ৫ হাজার ৬৭৪টি হাঁস-মুরগির খামারের প্রায় ১৭ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫ হাজার ২০১টি পুকুর ও মাছের খামারও।

জেলা প্রশাসনের দাবি, জেলার অধিকাংশ এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হবে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণ ও সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।