নজরদারি নেই লিঙ্গ নির্ধারণ বাণিজ্যে

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের পর নতুন করে আলোচনা

আদালত বলেছেন, শুধু একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বাস্তবায়ন, ডিজিটাল নজরদারি ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছাড়া এই অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়।

আদালতের এই মন্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে— দীর্ঘদিন ধরে মনিটরিং ও জবাবদিহির যে ঘাটতি ছিল, তার দায় আসলে কার?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গাফিলতির দায় কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং বহুস্তরীয় ব্যর্থতার ফল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), স্থানীয় প্রশাসন এবং বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটিকে জিইয়ে রেখেছে।

দেশে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা দ্রুত বিস্তৃৃত হলেও এর ব্যবহার কতটা নীতিমালার মধ্যে হচ্ছে, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি গড়ে ওঠেনি। ফলে গোপনে অনাগত শিশুর লিঙ্গ জানিয়ে দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা খুব কমই দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি মূলত চিকিৎসা ও গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যগত অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা। কিন্তু কিছু অসাধু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে। কোথাও সরাসরি, কোথাও আবার ইঙ্গিতের মাধ্যমে শিশুর লিঙ্গ জানিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরোক্ষভাবে ‘জেন্ডার কনফারমেশন’ বা ‘বেবি জেন্ডার টেস্ট’ ধরনের প্রচারও দেখা যায়। অথচ এসব কনটেন্ট পর্যবেক্ষণ ও বন্ধে কার্যকর ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট।

নারী অধিকারকর্মী স্বপ্না আক্তার, যিনি মোহাম্মদপুর বস্তিতে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করেন। বলছিলেন, ‘এটি শুধু স্বাস্থ্যগত অনিয়ম নয়; এটি নারীর প্রতি সামাজিক বৈষম্যের প্রতিফলন। সমাজে এখনো ছেলেসন্তানের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ এবং মেয়েসন্তানকে অবমূল্যায়নের প্রবণতা রয়েছে। অনেক পরিবারে গর্ভে মেয়েসন্তান আছে জানতে পারলে মায়ের ওপর মানসিক চাপ বাড়ে। কিছু ক্ষেত্রে গোপনে গর্ভপাতের মতো ঘটনাও ঘটে।’

এই সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় হাবিবা আক্তারের জীবনেও। দুটি যমজ কন্যাসন্তানের মা হাবিবা বললেন, ‘প্রথম দিকে আমি খুব মানসিক চাপে ছিলাম। পাড়া-প্রতিবেশীর অনেকে নানা ধরনের কটূক্তি করত। কেউ কেউ আফসোস করে বলত, ছেলে হলে নাকি বেশি ভালো হতো। এসব কথা শুনে আমি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।’

জোসনা বেগমের অভিজ্ঞতা আরও বেদনাদায়ক। ছেলেসন্তানের আশায় একের পর এক পাঁচ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘ছেলে না থাকলে পরিবারের সম্পত্তি ও সিদ্ধান্তে নারীরা অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। তাই পরিবার থেকেও ছেলের জন্য চাপ ছিল।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আল্ট্রাসনোগ্রাফি নিজে কোনো সমস্যা নয়; মূল সমস্যা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতায়। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভে সন্তান মেয়ে জেনে ভ্রূণ নষ্ট করার মতো অনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যতদিন সমাজে ছেলেসন্তানের প্রতি অতিরিক্ত চাহিদা থাকবে, ততদিন এ প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হবে না।’

তিনি আরও বললেন, ‘ভ্রূণের লিঙ্গ জানার পর তাকে হত্যা করার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও কার্যকর নজরদারি জরুরি। সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবৈধভাবে ভ্রূণ নষ্টকারী ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি টেলিভিশনে সচেতনতামূলক প্রচার, গ্রামে ক্যাম্পেইন এবং পরিবারভিত্তিক সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মেয়েসন্তানের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে।’

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের আওতায় থাকলেও তাদের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকির ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, চিকিৎসকরা নৈতিকতার সীমা মানছেন কি না, কিংবা রোগীর তথ্য কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে— এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। আদালতের পর্যবেক্ষণ, তাই মূলত নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার দিকেই ইঙ্গিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন করলেই হবে না; মেয়েসন্তানকে বোঝা নয়, সমান মর্যাদার মানুষ হিসেবে দেখার সামাজিক মানসিকতা গড়ে তুলতে না পারলে এই অনৈতিক বাণিজ্য বন্ধ করা কঠিন হবে। কারণ গর্ভে শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণের প্রবণতা মূলত প্রযুক্তির অপব্যবহারের চেয়ে বেশি একটি সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ প্রকাশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রায় দেন। রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান আদালতে বললেন, ভারতে আইন করে গর্ভজাত সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গর্ভের শিশুর লিঙ্গ প্রকাশের ফলে প্রসূতি মায়ের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক চাপে গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটে। এ বিষয়ে ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি জনস্বার্থে রিট দায়ের করা হয়।