দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না বিএনপি। তবে দলের হেভিওয়েট কয়েকজন নেতাসহ অন্তত শতাধিক নেতা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দল ত্যাগ করেছেন। যেখানে বিএনপির বর্তমান নেতা, বহিষ্কৃত ও পদবঞ্চিতরাও আছেন। গত ১৫ নভেম্বর ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের অন্তত ২৫ নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দলের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই নেতারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে জামিনে কারাগার থেকে আসা অনেকের সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র এক নেতা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান দাবি করেছেন, বিএনপিকে বিভক্ত করাই সরকারের কৌশল। দল ভাঙার চেষ্টা অতীতেও সফল হয়নি এবং এবারও ফল দেবে না। এ বছরের শুরুর দিকে সিটি নির্বাচনেও একই অবস্থা দেখা গিয়েছিল। তখন বিএনপির কয়েক ডজন নেতা মেয়র ও কাউন্সিলর হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাদের সবাইকে বহিষ্কার করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি। নির্বাচনে অংশ নিতে বিভিন্ন দল থেকে মনোনয়ন জমা দেওয়া সাবেক নেতাদের অধিকাংশই বিএনপির পদচ্যুত নেতা। এই নেতাদের মধ্যে অন্তত ৪০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে ঢাকা ট্রিবিউন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে জেলাভিত্তিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। তারা জেলা বিএনপির প্রধান নেতাদের সঙ্গে কাজ করছেন। তবে ৭-১০ বছর পার হয়ে গেলেও তাদের অনেকেই দলের কোনো পদ পাননি। তারা দীর্ঘদিন ছাত্রদলের সঙ্গে ছিলেন। পরে দলের আদর্শকে সমুন্নত রেখে বিএনপির হয়ে কাজ করেছেন। তবে ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতি ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা। তাই দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। হেভিওয়েট নেতারাও ভোটের রাজনীতিকে উপেক্ষা করতে পারেন না। বগুড়া-৫ আসনে তৃণমূল বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক বিএনপি নেতা মাহবুব আলী। তিনি বলেন, “সাত বছর ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পর্যন্ত তদবির করেও জেলা পর্যায়ে কোনো পদ পাইনি।” তিনি বলেন, “আমি ৪০ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করছি। আমি রাজনীতি শুরু করি ছাত্রদল দিয়ে। পরে বিকল্প ধারায় যোগ দিলেও আমি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম এবং সকল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। কিন্তু দল থেকে কখনো সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাইনি। তাই আমি দল ছেড়ে এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা থেকে বিএনপি নেতারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তবে দলে তাদের প্রভাব ও অবস্থান বড় না হওয়ায় আলোচনায় আসছেন না তারা। নওগাঁ-৬ আসনের তৃণমূল বিএনপির আরেক প্রার্থী পিকে আবদুর রব বলেন, “বিএনপিতে আমার কোনো সাংগঠনিক পদ ছিল না। একসময় আমি ছাত্রদলের কলেজ শাখার সভাপতি ছিলাম। পরে বিএনপির জেলা কমিটির সাধারণ সদস্য হিসেবে কাজ করেছি।” নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “বিএনপি জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার ও দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সুতরাং, কেউ যদি এই মূল্যবোধে বিশ্বাস না করে বা আন্দোলনের অংশ হতে না চায়, তবে তাকে তাদের পদ থেকে বরখাস্ত বা বহিষ্কার করা হবে। কিছু লোক জবরদস্তির অধীনে থাকতে পারে, এবং কিছু লোকের স্বল্পমেয়াদী আকাঙ্খা থাকতে পারে, তবে নাগরিকদের অধিকার সবার উপরে।”
রাজনীতিতে ভোটের গুরুত্ব
দলটি এ পর্যন্ত তাদের আট কেন্দ্রীয় নেতাকে বহিষ্কার করেছে। তারা হলেন- সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান, তাঁতি বিষয়ক সহ-সম্পাদক রাবেয়া সিরাজ, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আবু জাফর, শাহ শহীদ সরওয়ার, মতিউর রহমান মন্টু, খন্দকার আহসান হাবীব, এ কে এম ফখরুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিনে ঝালকাঠি-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শাহজাহান ওমরের প্রার্থিতা ঘোষণার ঘটনা ছিল বহুল আলোচিত। ওই দিনই তাকে বহিষ্কার করা হয়। বুধবার জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন ওমর। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, “আমরা জানি, দল পাল্টে যাওয়া বিএনপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা নির্বাচনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপে ছিলেন। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাননি, আর হবে না। বিএনপি থেকে যারা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তারা দলের কোনো পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা নন।” কুমিল্লা-৫ আসনে তৃণমূল বিএনপি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বহিষ্কৃত ভাইস চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক শওকত মাহমুদ। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাননি। দেশের পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনে আসা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। অন্যদের মধ্যে শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক বিএনপির শক্ত ঘাঁটি বগুড়া-৭ আসন থেকে তৃণমূল বিএনপি থেকে নির্বাচনে অংশ নেবেন। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বহিষ্কৃত উপদেষ্টা একরামুজ্জামান। অন্যদিকে অনেক সিনিয়র নেতা বিএনপি ছেড়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তৃণমূল বিএনপিসহ একাধিক দল গঠন করেছেন। গাজীপুর মহানগর বিএনপি নেতা ও বাসন থানা বিএনপির সহ-সভাপতি জব্বার সরকার, সাবেক ছাত্রনেতা ও ঠাকুরগাঁও হরিপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোজাফফর আহমেদ, তৃণমূল বিএনপি থেকে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সহ-সভাপতি আব্দুল কাদির তালুকদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি ছেড়ে ফরিদপুর-১ থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন সাবেক নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু জাফর। এখন তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলে বড় কোনো পদ না থাকলেও বগুড়া জেলা বিএনপির জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ও চারবারের সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মোল্লা বগুড়া-৪ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তারা ছাড়াও টাঙ্গাইল-৫ থেকে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আহসান হাবিব ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টাঙ্গাইল-৬ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দেলদুয়ার উপজেলা বিএনপির সদস্য খন্দকার ওয়াহিদ মুরাদ। এছাড়াও বগুড়া-৭, বগুড়া -২, ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-২, ফরিদপুর-২, নীলফামারী-৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, ঝালকাঠি-২ আসনে দুই ডজন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা জানান, বিএনপি ও তৃণমূল বিএনপি গঠনের পর থেকেই সতর্ক রয়েছে দলীয় নেতৃত্ব। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ সিনিয়র নেতারা দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও আন্দোলনে সক্রিয় থাকতে দলের অসন্তুষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। দলের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করলে কাউকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি হাইকমান্ড।