মানিকগঞ্জে অভিযুক্ত হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক এখনো বহাল তবিয়তে

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মানিকগঞ্জে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা না দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের তৎকালীন ও বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. বাহাউদ্দীনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগের প্রায় এক বছর পরও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের গতি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে। একই সঙ্গে মামলায় অভিযুক্ত হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এখনো দায়িত্ব পালন করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী ও মামলার বাদী।

এ ঘটনায় তৎকালীন মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার গোলাম আজাদ খান, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বাহাউদ্দীনসহ ২১৭ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী মেহেরাব। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে মামলাটি তদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর থানাকে নির্দেশ দেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়েনি।

মামলার বাদী মেহেরাবের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ুবৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে তিনি, হাসনা, আরমানসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। আহত অবস্থায় তারা চিকিৎসার জন্য মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে গেলে সেখানে দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক ডা. বাহাউদ্দীন তাদের চিকিৎসা না দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মেহেরাবের দাবি, তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশে কর্তব্যরত নার্স জান্নাতারা শিমুল, আনিসুর রহমান, সাইফুলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীরা আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা থেকে বিরত থাকেন। ফলে আহত অবস্থায় হাসপাতাল থেকে বের হয়ে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার বেসরকারি হাসপাতাল ‘মেডিলার’-এ গিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন তারা।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মানিকগঞ্জ সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহকে ফোন করে আহত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
শিক্ষার্থীদের ‘জেলায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে’ অভিযোগে গ্রেপ্তারের বিষয়েও কথা বলা হয়েছিল বলে মামলার বাদীর দাবি।

সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রের একটি সরকারি হাসপাতালে আহত নাগরিক চিকিৎসা চাইতে গিয়ে যদি রাজনৈতিক পরিচয় বা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সেই সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহি কোথায়? আর এমন অভিযোগে মামলা হওয়ার পরও তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে ন্যায়বিচারের বার্তা কি?
মামলার বাদী মেহেরাব বলেন, “আমাদের মামলা এখনো শেষ হয়নি। গত জুলাই মাসের ৯ তারিখে আমি মামলার হাজিরা দিয়েছি। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মামলার তারিখ ধার্য আছে। যে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের আসামি করা হয়েছে, সেই পুলিশ বাহিনীর কাছেই মামলার তদন্ত দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি হচ্ছে বলে আমরা মনে করছি। দেশে এখনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।”

মেহেরাব আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলনের সময় আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা না দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীদের কয়েকজনের দাবি, তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ওই কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের মতে, আন্দোলনের সময় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়ে ওঠা অভিযোগ শুধু কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, মানবিকতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে মামলার তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন জরুরি।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—আহত মানুষের চিকিৎসার অধিকার যদি সংকটের সময়ও নিশ্চিত না হয়, আর সেই অভিযোগের তদন্তই যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার চাইবে কার কাছে?

দেশের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি উঠেছে, মামলাটির তদন্ত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্তভাবে সম্পন্ন করে প্রকৃত ঘটনা আদালতের সামনে তুলে ধরা হোক। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদেরও যথাযথভাবে অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

এদিকে মামলার তদন্তের বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে ডা. বাহাউদ্দীন বলেন, “প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশনায় আমি ছাত্রদের চিকিৎসা দিইনি।”
তিনি আরও দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের করা মামলাটি দুই বছর আগেই খারিজ হয়ে গেছে।গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “আপনারা কোনো অ্যাসাইনমেন্টের জন্য এলে জেনে-বুঝে আসবেন। দুই বছর আগে মামলা হয়েছিল, আজকে আপনারা আসছেন। যারা আপনাদের পাঠিয়েছে, তাদের নিয়ে আসেন, আমি সব বুঝিয়ে দেব।”
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডাক্তার আইভি ফেরদৌস বলেন, আমি অল্প কিছুদিন হয় মানিকগঞ্জে এসেছি, আপনি যেভাবে ডিটেলস বললেন আমি এইভাবে শুনিনি। আমি শুনেছি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তিনি হাসপাতাল থেকে বিনা অনুমতিতে চলে গিয়েছিলেন। কিভাবে হাসপাতলে দায়িত্ব পালন করছেন তা আমি এ বিষয়ে বলতে পারব না। উনার নামে যে মামলা হয়েছে তা আমি জানতাম না আপনার মাধ্যমেই শুনলাম।