জুলাই আন্দোলনে সরব থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন দুই বছর পর নীরব?

জুলাই আন্দোলনে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, শহর-গ্রাম বা শ্রেণি-পেশার ভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল তরুণ প্রজন্ম। রাজপথে পরিচয় একটাই ‘সহযোদ্ধা’। তবে অভ্যুত্থানের দু-বছর পর সেই ঐক্যের জায়গায় কেন বিভক্তির আলোচনা? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন কতটা আছেন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত, সংস্কার ও প্রতিনিধিত্বের আলোচনায়?

জুলাই, যেখানে রাজপথজুড়ে রক্তের রঙে কোনো বিভেদ ছিল না। স্বপ্নটাও ছিল একই সরলরেখায়। হাতে হাত, পায়ে পা, স্লোগান, মিছিল, দাবি-দাওয়া, সবখানেই ছিল—দেশ সবার আগে।

কিন্তু প্রশ্নটা জুলাই-পরবর্তী। আন্দোলনে প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধে, যেখানে পরিচয় ছিল সহযোদ্ধা, সময়ের আবর্তে সেখানে কেন উঠছে বিভক্তির প্রশ্ন—সরকারি আর বেসরকারিতে?

আন্দোলন যখন মধ্যগগনে, ঠিক তখন তার বেগটাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দাঁড়িয়েছিলেন বন্দুকের নলের সামনে, পরোয়া করেননি টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের হুমকি। এমনকি মৃত্যু নামক শব্দটাকেও বুকে টেনে নিতে করেননি কুণ্ঠাবোধ।

আন্দোলনরত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও আপনি দেখাতে পারবেন না, যিনি মারা গিয়েছেন বা শহীদ হয়েছেন। যখন আমরা ব্র্যাকের দিকে আসছিলাম, তখনই আমরা অলরেডি সাত থেকে আটজনের মৃত্যুর খবর পাই। তারপরও আমরা দমে যাইনি। আমরা চাচ্ছিলাম এ দেশের জাতিকে মুক্ত করতে। সে জন্যই আসছিলাম।

সেসময় কারও মাথায় রাবার বুলেট, কারও শরীরে হিট লেগেছে। কেউ টিয়ারশেলের কারণে কাঁদছে, কারও হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে, কেউ চ্যাংদোলা করে আহতদের নিয়ে যাচ্ছে। ১৪ তারিখে পরিস্থিতি এমনই ছিল।’

অথচ সেই আবেগ এখন যেন আর্কাইভ ফুটেজ। কোথায় দু-বছর আগের সেই দাবানল? আলোচনার গোলটেবিলে কোথায় তাদের সেই স্লোগানমুখর মুখ? রাষ্ট্রের অংশীদারিত্বেও কি আছে তাদের স্বপ্নের উচ্চারণ? নাকি তারা নেই?

আন্দোলনে নিজেদের অংশগ্রহণ নিয়ে শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, ‘হয়তো আন্দোলনে আমরা ছিলাম, কিন্তু কোনো কিছু ভাগাভাগি করতে যাইনি। কারণ আমাদের সেটার দরকারও নেই। যখন অন্তর্বর্তী সরকার ছিল, তখন আমাদের সমন্বয়কদের বা বিভিন্ন জায়গা থেকে সমন্বয়ক নেয়া হয়েছিল। তখন হয়তো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু-একজনকে রাখা যেতে পারত। এটুকুই হয়তো আমাদের চাওয়া। পলিটিক্যাল গ্রুমিংয়ের যে অভাব, সেই গ্রুমিংয়ের অভাবের কারণেই আমরা নিজেদের সেভাবে মেলে ধরতে পারিনি।’

আন্দোলনে অংশগ্রহণ আর পরবর্তী রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—এ দুটি যদিও ভিন্ন বিষয়। তবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিংবা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বয়ান ও ক্ষমতাচর্চাও তো জুলাইয়ের স্পিরিট নয়। এখন কি তবে স্বপ্ন দেখা বন্ধ, নাকি অন্য কোনো দ্বন্দ্ব?

ক্ষোভ প্রকাশ করে একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘হয়তো আমরা পলিটিক্যালি এনগেজ ছিলাম না। কিন্তু পলিটিক্যালি কনশাস হওয়ার কারণে আন্দোলনের পরও আমরা থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ইন দ্য নেম অব পলিটিক্স, নোংরা রাজনীতির মাধ্যমে আমাদের সেই জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। একটি গোষ্ঠী আসলে মনে করেছে, তারা জুলাইকে হাইজ্যাক করে নেবে। তারা জুলাইকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা করলেও সেভাবে পারেনি। সত্যিকার অর্থে নতুন ধারার একটি রাজনৈতিক দল হওয়া উচিত ছিল, যেটা এনসিপি করতে পারত। কিন্তু এনসিপি এখানে ফেল করেছে।’