অডিট আপত্তির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ছাড়াই বিতর্ক

দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ব্যয় ও বিভিন্ন কাজ নিয়ে অডিট আপত্তিকে কেন্দ্র করে একটি মহলে নানা প্রশ্ন তোলা হলেও সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর অনেকগুলোরই এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। তদন্ত ও অডিট প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় এসব বিষয়কে চূড়ান্ত অনিয়ম হিসেবে উপস্থাপন করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী সংযোজন। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে এ প্রকল্প অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয়, বিল পরিশোধ, নকশা পরিবর্তন ও কাজের পরিধি নিয়ে অডিটে যেসব আপত্তি উঠেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা ও জবাব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বড় প্রকল্পে অডিট আপত্তি ওঠা একটি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। আপত্তি উত্থাপিত হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া নয়।
দায়িত্ব পালনের সময়ই উঠেছে নানা প্রশ্ন
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের সঙ্গে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে মো. আফজাল হোসেনের সম্পৃক্ততা থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। বরং অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তদন্ত ও ব্যাখ্যা গ্রহণের প্রক্রিয়া রয়েছে।

অডিট আপত্তির ক্ষেত্রে সাধারণত সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র, বিল, কার্যাদেশ, চুক্তির শর্ত এবং বাস্তব কাজের পরিমাণ যাচাই করে আপত্তির নিষ্পত্তি করা হয়। ফলে তদন্ত বা নিষ্পত্তির আগে কোনো কর্মকর্তাকে অনিয়মের জন্য দায়ী করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় অর্জন
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের রেল খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি। পদ্মা সেতু দিয়ে রেল চলাচল চালুর ফলে রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন, যাত্রী চলাচল এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এত বড় ও জটিল প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা, মাটি, সেতু, রেললাইন, স্টেশন, সিগন্যালিংসহ বিভিন্ন কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয় সমন্বয় করতে হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বাস্তব পরিস্থিতির কারণে কাজের পরিধি বা নকশায় পরিবর্তন আসাও অস্বাভাবিক নয়। এসব পরিবর্তনের আর্থিক ও কারিগরি যৌক্তিকতা যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান রয়েছে।
অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পের অডিটে কোনো ব্যয় নিয়ে আপত্তি উঠলে প্রথমেই সেটিকে দুর্নীতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। অডিট আপত্তির একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যাখ্যা ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অডিটের উত্থাপিত বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণের পরই প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাই অনাকাঙ্ক্ষিত।

দায়িত্বে আফজাল হোসেন, কাজেই আস্থা
বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেও মো. আফজাল হোসেনকে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের (ডিজি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যায়, দায়িত্ব পালনে তাঁর প্রশাসনিক ও পেশাগত সক্ষমতার ওপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আস্থা রয়েছে।
কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অভিযোগের ভিত্তিতে কারও পেশাগত সক্ষমতা বা দীর্ঘদিনের কর্মজীবনকে মূল্যায়ন না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও অডিট নিষ্পত্তির ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য।

অপপ্রচার নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পদ্মা সেতু রেল সংযোগের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তাধীন কোনো বিষয়কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রচার না করে প্রকল্পের বাস্তব অর্জন, অডিট আপত্তির প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যাও জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।
কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দায়ী করে উপস্থাপন করা হলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পেশাগত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধানের পথও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অডিট আপত্তিগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে না যাওয়ার পক্ষেই মত সংশ্লিষ্টদের।