এফবিবিসিসিআই’র সভাপতি হচ্ছেন মাহবুব আলম
চট্টগ্রাম থেকে ইতিপূর্বে জহিরউদ্দিন খান ও আখতারুজ্জামান বাবু এফবিবিসিসিআই’র সভাপতির পদ অলংকৃত করেছিলেন
দেশের ব্যবসায়ী সমাজের শীর্ষ সংগঠন দি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) নির্বাচনের আরো এক মাস বাকি। এরই মধ্য আলোচনা শুরু হয়েছে শীর্ষ এই ব্যবসায়িক সংগঠনের আগামী নেতৃত্ব নিয়ে। কে বসতে যাচ্ছেন এফবিসিসিআই’র চালকের চেয়ারে। নির্বাচনকে ঘিরে সরব হয়ে ওঠেছে রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত এফবিসিসিআই ভবন। নির্বাচনী ঢেউ আছড়ে পড়েছে রাজধানী ছাড়িয়ে চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে।
স্বাধীন বাংলাদেশে চট্টগ্রামের দুইজন বরেণ্য শিল্পপতি এফবিসিসিআই’র শীর্ষ পদ অলংকৃত করেছিলেন। প্রায় ৩৩ বছর পর চট্টগ্রামের আরেক ব্যবসায়ীর এফবিসিসিআই’র পরবর্তী সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। দেশের শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি-প্রকৃতি যাদের কব্জায় তাদের চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে এফবিসিসিআই’র আগামী সভাপতির নাম, যার নাভিকাটা মাতৃভূমি চট্টগ্রাম।
দেশের শীর্ষ এই ব্যবসায়িক সংগঠনের শীর্ষ পদে তাঁর উপর ভরসা রাখছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরাই। নির্বাচনী পরিবেশ অন্য কোনো নাটকীয়তার দিকে মোড় না নিলে চট্টগ্রাম চেম্বারের বর্তমান সভাপতি মাহবুব আলমই হতে যাচ্ছেন এফবিসিসিআই’র পরবর্তী কান্ডারী। এজন্য চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাও ভাসছেন আনন্দ। তাঁরা বলছেন, যোগ্য নেতৃত্বই বসতে যাচ্ছেন এফবিসিসিআই’র শীর্ষ পদে।
শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন এফবিসিসিআই’র নেতৃত্ব প্রদানের মতো চট্টগ্রামে অনেক উদ্যমী এবং অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী নেতা থাকা সত্তে¡ও স্বাধীনতার পর মাত্র দুইজন ব্যবসায়ী এটির ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। যোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে এই দুই বরেণ্য সাবেক সভাপতির দেশের শিল্পায়নে অবদান হিমালয়তুল্য। একজন হলেন সাবেক মন্ত্রী, শিল্পপতি ও দেশবরেণ্য সমাজসেবী এ কে খান কোম্পানীর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান এ এম জহিরউদ্দীন খান এবং অন্যজন হলেন ব্যাংকিং জগতের পথিকৃত, শিল্পপতি ও জননন্দিত রাজনীতিবিদ আখতারুজ্জমান চৌধুরী (বাবু)।
জানা যায়, প্রয়াত জহির উদ্দীন খান ১৯৭৭ সালে এফবিসিসিআই’র সভাপতি নির্বাচিত হন। আর প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী ১৯৮৭-১৯৮৯ মেয়াদের জন্য দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দুজনেই আবার চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি ছিলেন। এবার এফবিসিসিআই’র সভাপতি হতে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম চেম্বারের টানা পাঁচবারের সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম।
গত ২০ জুন রাজধানীতে ব্যবসায়ীদের এক অনুষ্ঠানে পরবর্তী সভাপতি হিসেবে মাহবুব আলমের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতিরা, যারা কিনা দেশের অর্থনীতির নিয়ামক শক্তি। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘ডেভেলপিং স্মার্ট লিডারশিপ টু ক্রিয়েট স্মার্ট ইকোনমি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি ও সংসদ সদস্য সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এ ঘোষণা দেন।
এ সময় উপস্থিত থেকে এফবিসিসিআই’র পরবর্তী সভাপতি হিসেবে মাহবুব আলমের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বর্তমান সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন, সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ, সাবেক সভাপতি মাহবুবুর রহমান, কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, মীর নাসির, আবদুল আওয়াল মিন্টু। দর্শক সারিতে দাঁড়িয়ে মাহবুব আলমের প্রতি সমর্থন জানান উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতারাও।
অনুষ্ঠানে সালমান এফ রহমান বলেছেন, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সরকার ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। ব্যবসায়ীদের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী কোরবানির ঈদের পর বসবেন। তিনি সব ব্যবসায়ীর কথা শুনবেন।
এফবিসিসিআই’র বর্তমান সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেছেন, এফবিসিসিআইতে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। ভালো লিডার থাকলে সেগুলো সম্ভব। সরকার বলেছে, দেশের অর্থনীতির ৮২ শতাংশ বেসরকারি খাতের অবদান। এ সংগঠনে উপযুক্ত নেতা দরকার। আগামী নেতৃত্ব এফবিসিসিআইকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সমর্থন থাকায় নির্বাচনের আগেই এফবিসিসিআই’র পরবর্তী সভাপতি হিসেবে মাহবুব আলমের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন সাবেক সভাপতিরা।
এফবিসিসিআই’র সভাপতি হিসেবে দেশসেরা ব্যবসায়ীরা মাহবুব আলমের নাম ঘোষণা করলেও রয়ে গেছে কিছু আনুষ্ঠানিকতা। সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন এফবিসিসিআই’র বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী মাসে।
নির্বচনী তফসিল অনুযায়ী, এফবিসিসিআই পরিচালনা পরিষদের ২০২৩-২০২৫ মেয়াদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৩১ জুলাই। ওইদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীন ভোটগ্রহণ শেষে পরিচালক পদে নির্বাচিতদের নাম ঘোষণা হবে। পরে ২ আগস্ট নির্বাচিত পরিচালকদের ভোটে সংগঠনটির সভাপতি, একজন জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও ছয়জন সহ-সভাপতি নির্বাচন করা হবে।
ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। পরিচালক পদে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ জুলাই। ১৫ জুলাই প্রকাশ করা হবে প্রার্থী তালিকা। আর প্রার্থিতা বাতিলের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ জুলাই। একইদিন প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা।
ফবিসিসিআই’র সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০২১ সালের মে মাসে। সভাপতি হন মো. জসিম উদ্দিন। তবে পরিচালক থেকে শুরু করে সভাপতি, জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ও ছয় সহ-সভাপতি পদের নির্বাচনের কোনো পর্যায়েই ভোট দিতে হয়নি ব্যবসায়ীদের। সমঝোতার ভিত্তিতে পরিচালনা পরিষদ গঠন করা হয়। এতে ঠাঁই হয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের। এর আগের নির্বাচনও হয় বিনা ভোটে। সংগঠনটির সর্বশেষ ভোট হয় ২০১৭ সালে। ওই সময় সভাপতি নির্বাচিত হন শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন (বর্তমানে এমপি)।
এবার এফবিসিসিআই’র সভাপতি, সাত সহসভাপতি ও পরিচালনা পরিষদ সমঝোতা নাকি ভোটের মাধ্যমে হতে যাচ্ছে তা জানার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী নেতারা আগেভাগে যে বার্তা দিলেন তাতে মনে হচ্ছে সমঝোতার পথে হাঁটছে এফবিসিসিআই।
যে প্রক্রিয়াই নির্বাচন হোক না কেন, চট্টগ্রামের সন্তান মাহবুব আলম সংগঠনটির পরবর্তী সভাপতি হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন সবাই। তারা বলছেন, এফবিসিসিআই’র নেতৃত্ব দেয়ার মতো দক্ষতা ও যোগ্যতা মাহবুব আলমের রয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠনের কর্মকান্ড পরিচালনায় তিনি গতিশীল নেতৃত্ব ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম চেম্বারের সহ-সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর দেশ বর্তমানকে মুঠোফোনে বলেন, নিঃসন্দেহে এটি গর্ব করার মতো সংবাদ। চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ীর যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্তে¡ও এফবিসিসিআই’র নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র দুইজন।
চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক দিয়ে একটি গুরত্বপূর্ণ শহর হলেও জাতীয় পর্যায়ে ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম থেকে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ হয়নি। সেদিক দিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজ তথা সাধারণ মানুষের জন্য এটি আশাব্যঞ্জক খবর।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্যাসিফিক জিন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরুণ শিল্পপতি সৈয়দ তানভীর বলেন, এফবিসিসিআই’র নেতৃবৃন্দ সংগঠনটিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সঠিক সময়ে যোগ্য ব্যক্তিকেই বেছে নিয়েছেন। মাহবুব আলমের নেতৃত্বে এফবিসিসিআই বহুদূর এগিয়ে যাবে, পাশাপাশি বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে তিনি চট্টগ্রাম চেম্বারের কর্মকান্ড আরো গতিশীল করতে ভূমিকা রাখবেন।
চট্টগ্রাম চেম্বারের বর্তমান সভাপতি মো. মাহবুব আলম এফবিসিসিআই’র সভাপতি হওয়া প্রসঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ বর্তমানকে একক প্রার্থী হিসেবে সভাপতি হওয়ায় সম্ভাবনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, সবসময় ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছি। সভাপতি নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন বাস্তবায়নে কাজ করে যাব।
উল্লেখ্য, মো. মাহবুবুল আলম ২০১৫-২০১৭ মেয়াদে এফবিসিসিই’র সহ-সভাপতি ছিলেন। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের এই ব্যবসায়ী ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯০৬ সালে যাত্রা শুরুর পর ১২২ বছরের পুরোনো এই ব্যবসায়ী সংগঠনে টানা পাঁচবার সভাপতি হয়ে রেকর্ড গড়েন তিনি।
এর আগে আর কেউ এ চেম্বারে একটানা পাঁচবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেননি। স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতৃত্ব দেয়া আটজন সভাপতি বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরমধ্যে তিনজন আবার মন্ত্রী হন।