বিএনপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ইঙ্গিতের আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে জামায়াত। তারা বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনেও অংশ নেবে। তবে জামায়াতের যোগাযোগ বৃদ্ধিতে বিএনপির বড় একটি অংশের নেতারা বেশ নাখোশ বলে জানা গেছে। কিন্তু সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যখন চাইছে সিনিয়র নেতারা কেউ মুখ খুলছেন না। বিএনপির ঘনিষ্ট সূত্র বলেছে আগামী দিনে ভোটের মাঠে জামায়াতের ভোট ব্যাংকে কাজে লাগাতেই নমনীয়তা প্রদর্শন মাত্র। এদিকে আগামী ১০ জুন রাজধানীতে সমাবেশের কর্মসূচী ঘোষণা করে আবার আলোচনায় চলে আসছে ধর্মভিত্তিক এ দলটি। তবে গতকালও ডিএমপি তাদের সমাবেশ করার অনুমতি দেয়নি বলে জানা গেছে। এসবের পাশাপাশি ভোটের প্রস্তুতিকাজও চালাচ্ছে একেবারে গোপনে। তাদের ১০০ আসনের টাগের্ট রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
২০১৮ সালের পর নানাভাবে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা ও প্রকাশ্য জোটগত অবস্থান না থাকলেও আবারও বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির উচ্চ পর্যায়ের দুই নেতার সঙ্গে জামায়াতের একাধিক নেতার আলাপ হয়। সেই আলোচনায় উভয় দলের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমানোর প্রক্রিয়ার বিষয়টিও স্থান পায়। বিএনপি ও জামায়াতের উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এসব তথ্য জানান।
জামায়াতের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি বিএনপির দুই সিনিয়র দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে জামায়াতের একাধিক নেতার বৈঠক হয়। তবে বৈঠকটি কোথায় হয়েছে, তা জানা যায়নি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্মতির ভিত্তিতেই উভয় পক্ষের কাছে আসা বলে সূত্রের দাবি।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াত পারস্পরিকভাবে যোগাযোগ করছে। উভয় দলের মধ্যে যোগাযোগ হচ্ছে।’
মূলত ২০১৫ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মৌলবাদী দল হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নেন বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পর্ক কমাতে শুরু করে বিএনপি। ওই বছরের আগস্টে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেন বিএনপির তৃণমূল নেতারা। যদিও ওই নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে ধানের শীষ মার্কা দেওয়ার মধ্য দিয়ে সম্পর্কে আবারও উষ্ণতা ফিরে আসে উভয়পক্ষে। নির্বাচনের পর ধীরে ধীরে আবারও ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে আনতে শুরু করে বিএনপি।
বিএনপি নেতারা জানান, ২০২০ সালে করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে-আগে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জোটসঙ্গী জামায়াতকে নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করে বিএনপি। ওই পর্যালোচনায় স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য জানিয়েছেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর গুরুত্ব অনেকাংশেই কম। সে কারণে জামায়াতের সঙ্গে বিদ্যমান জোটগত সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখা প্রয়োজন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একজন সদস্যের মতে , ‘প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের কোনও পক্ষের পরামর্শে জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে বিএনপি। পশ্চিমাদের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক ভালো। সেদিক থেকে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় জামায়াতের ওপর আন্তর্জাতিক কোনও চাপ ছিল না।’
আজকালের মধ্যে পশ্চিমা একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের ঢাকায় নিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে জামায়াতের বৈঠক আছে বলেও জানান এই সদস্য।
বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক দৃশ্যমান হবে না। তারা বিএনপির পাওয়ার পকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা মনে করেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চেয়ে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মেইনটেইন করা সহজ ছিল।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মতো ২০২১ সালের শুরু থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার কাজ শুরু করে বিএনপি। এরপর নানা কর্মসূচিতেও বিএনপি-জামায়াত শীতলতা প্রকাশ্যে আসে।
২০২১ সালের ৩০ অক্টোবর ‘এই জামায়াত বাংলাদেশকে আজ এই জায়গায় নিয়ে এসেছে’ বলে দলটির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার মুখে শোনা যায়, ‘এসবই জামায়াতের ফাইজলামি।’
এরইমধ্যে ২০২২ সালের শেষদিকে এসে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট তথা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা হয়। একই বছর অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে মতবিনিময় করলেও জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্যে কোনও বৈঠক থেকে বিরত থাকে বিএনপি।
ওই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ দলীয় এক সমাবেশে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মুখে প্রায়ই শুনি, যেটা বুলি হয়ে গেছে। তারা প্রায়ই বলে, বিএনপি-জামায়াত, বিএনপি-জামায়াত। আমি বলছি, এখন সময় এসেছে আওয়ামী-জামায়াত, আওয়ামী-জামায়াত বলার। ওরা (আওয়ামী লীগ) জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে, কিন্তু বেআইনি ঘোষণা করে না। তাহলে কি আমি বলবো, উনাদের ‘পরকীয়া প্রেম’ চলছে!’’ তার এই বক্তব্যের পর জামায়াত থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো হয়। দলের ভেতরে ও বাইরের ডানপন্থি রাজনীতিকদের চাপে পড়েন ইকবাল হাসান মাহমুদ।
প্রকাশ্যে ছাড়াও বিএনপির ভেতরে আরও বেশ কয়েকজন নেতা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক নিরোধের পক্ষে অবস্থান নেন। ওই নেতাদের মধ্যে একজন যিনি দলের
ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; নিজের নাম উদ্ধৃত না করে বলেন, ‘জামায়াতের অতীতের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তাদের সঙ্গে এখন সরকারের সম্পর্ক ভালো। এরপর বিদেশি দূতাবাসগুলোতে সম্পর্ক ভালো। এরপর বিএনপির সঙ্গে তাদের অবস্থান। বিএনপি এক্ষেত্রে তৃতীয়। সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তারা অনেক কিছু করতে পারে।’
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঘোষিত ১০ দফা ও ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিলের সঙ্গে মিল রেখে একই কর্মসূচি পালন করে জামায়াত। যদিও ৩০ ডিসেম্বর মালিবাগ মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় দলটির নেতাকর্মীরা। এরপর থেকে যুগপৎভাবে কোনও কর্মসূচি পালন করেনি জামায়াত।
দলের নির্বাহী পরিষদের প্রভাবশালী একজন নেতা বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলনে শুরু করবো। মাঝখানে তো উনারা (বিএনপি) বন্ধ করছেন। আবার যোগাযোগ শুরু করছে। অপেক্ষা করেন।’
বিএনপির সূত্র বলছে, কোনও বিষয় নিয়ে এখন দ্বিধা থাকলেও ঈদের পর এক দফা আন্দোলনে যাবে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলো। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি নির্ভর করবে জামায়াতের সঙ্গে কোন প্রক্রিয়ায় যাবে বিএনপি।
প্রসঙ্গত, গত ৫ জুন ঢাকায় বায়তুল মোকাররমে বিক্ষোভ করার কর্মসূচি ছিল জামায়াতের। ডিএমপির অনুমতি না পাওয়ায় তারা আবারও আগামী ১০ জুন শুক্রবার একই স্থানে সমাবেশ ডেকেছে। দলের নীতিনির্ধারকদের একজনের মন্তব্য, ‘আমরা সমাবেশ করবো। তবে আমরা এখনই কোনও সংঘর্ষে যেতে চাই না। দেখা যাক, ১০ জুন কী করে পুলিশ।’
তবে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির পুনরায় কাছে আসার বিষয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কোনও কোনও প্রভাশালী নেতা মনে করেন, এখন আর বিএনপির সামনে জামায়াতকে প্রকাশ্যে সম্পর্কে আনার সুযোগ নেই।
গত সোমবার দুপুরে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান গণমাধ্যমে বলেন, ‘জামায়াতকে আর বিএনপির সঙ্গে দরকার নেই। বিএনপির পরিচিতি, রাজনীতি, আত্মবিশ্বাস কিছুই ছিল না। বিএনপি ইতোমধ্যে রাজপথে একক শক্তি প্রদর্শন করে প্রমাণ করেছে তাদের একলা চলা নীতির কারণে দলের রাজনীতি পরিষ্কার হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি শুদ্ধ হয়েছে। আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়েছে। অনেক কর্মীও মনে করতো জামায়াত না থাকলে বিএনপি পারবে না। কিন্তু বিগত এক বছরে তা ভুল প্রমাণিত হয়ে গেছে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলয়ের একাধিক নেতা মনে করেন, সাংগঠনিক ভিত্তির কারণে জামায়াতকে আবারও মূল্যায়ন করার বিষয়টি সামনে আনছেন কেউ কেউ। বিএনপি জামায়াতকে ডাকেনি। বরং জামায়াতের অনুরোধে বিএনপি সাক্ষাৎ দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার পতনের লক্ষ্যে চূড়ান্ত আন্দোলনের পাশাপাশি দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনে কৌশলে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালাচ্ছেন। কর্মী, রুকন সম্মেলনসহ দলের সাংগঠনিক সভাগুলোতে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে জোরেশোরে। একই সঙ্গে চলছে সংগঠন গোছানোর কাজও। গত ১ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত দলীয় গণসংযোগে ৭০-৮০ হাজার লোক জামায়াতের নতুন সহযোগী সদস্য (সমর্থক) হয়েছেন। ইতোমধ্যে দেশজুড়ে দলীয় ভিত আরও শক্তিশালী করেছেন বলে জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতারবিরোধী দলটি মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যে আন্দোলনের পাশাপাশি এখন ভার্চুয়াল কর্মকাণ্ডকেও ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রায়ই তারা বিভিন্ন বিভাগ, মহানগর ও জেলায় সাংগঠনিক বৈঠক ও দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন।
সর্বোচ্চ শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দি¦তা করতে চায় দলটি, বিভিন্ন কৌশলে এসব আসনে সভা-সমাবেশের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে কেয়ারটেকার ছাড়া বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না দলটি। জামায়াতের তিনজন কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য বলেন, তারা ১০ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
জানা যায়, ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ৭৬টি আসনে প্রার্থী দিলেও ১০টিতে জয়ী হয়। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৪ সালের দশম নির্বাচন বর্জন করে দলটি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ২২২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১৮টিতে জয়ী হয়। ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনে জয় পায় দলটি। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ১৭টি আসনে জয়সহ চারটি সংরক্ষিত আসন পায় দলটি। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে দুটি আসনে জয়ী হয় দলটি। ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন (ইসি) জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে। এর আগে ২০০৯ সালে হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন। তবে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ২২টি আসনে প্রতিদ্বন্দি¦তা করেছিল জামায়াত।
আগামী নির্বাচন ঘিরে, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, কক্সবাজার, পাবনা, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, শেরপুর, ঢাকা, সাতক্ষীরা, সিলেট, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, পিরোজপুরসহ অর্ধশতাধিক জেলার শতাধিক আসনে ইতোমধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করে তাদের মাঠে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছে জামায়াত।
এমএফ