আনোয়ারায় কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়ার রঙে সেজেছে পথ-প্রান্তর
‘কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জুরি কর্ণে-আমি ভুবন ভুলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি আমাদের স্মরণ করে দেয় কৃষ্ণচূড়ার তাৎপর্য। আরও স্মরণ করিয়ে দেয় গরম এসেছে। কৃষ্ণচূড়া গ্রীষ্মের অতি পরিচিত ফুল। এই সময়টায় সারা দেশের ন্যায় প্রকৃতি অপরূপ কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া ফুলের সাজে সাজিয়ে তুলেছে চট্টগ্রাম আনোয়ারায় বিভিন্ন ইউনিয়ন।
উপজেলার বৈরাগ, বারশত, রায়পুর, জুঁইদন্ডী, বরুমচড়া ইউনিয়নে এ ফুলগুলো বেশি চোখে পড়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বৈশাখের রৌদ্দুরের সবটুকু উত্তাপ গায়ে মেখে নিয়েছে রক্তিম ও হলদি পুষ্পরাজি সবুজ চিরল পাতার মাঝে যেন লাল-হলুদে আগুন জ্বলছে। গ্রীষ্মের ঘামঝরা দুপুরে কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়ার ছায়া যেন প্রশান্তি এনে দেয় অবসন্ন পথিকের মনে। তাপদাহে ওষ্ঠাগত পথচারীরা পুলকিত নয়নে, অবাক বিস্ময়ে উপভোগ করেন এই সৌন্দর্য। তাইতো বাঙালির কবিতা, সাহিত্য, গান ও বিভিন্ন উপমায় কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া ফুলের কথা নানা ভঙ্গিমায় এসেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত রাষ্ট্রীয় সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) সড়কের পৌনে এক কিলোমিটার জুড়ে একপাশে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া ফুলের প্রেমে মজেছে ছোট বড় সকলেই। রোদের আলো পড়লেই জ্বল জ্বল করে উঠছে কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া ফুল। বিকেল নামলে দূর-দূরান্ত থেকে আসতে থাকে প্রকৃতি প্রেমীরা।

আনোয়ারা উপজেলা ছাড়াও পাশের উপজেলা কিংবা চট্টগ্রাম শহর থেকে ছুটে আসছে ভ্রমণ পিপাসুরা। অনেকে বিকেলের সময় কাটাতে আসেন পরিবার পরিজন নিয়ে। আবার কেউ কেউ এদিক দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি থামিয়ে এ সৌন্দর্য উপভোগ করেন। সন্ধ্যা হলেই সকল শ্রেণির ভ্রমণ পিপাসুরা মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, সিএনজি (অটোরিকশা) করে আসছে কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া ফুলের সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে সেলফি তুলছে।
বাঙালিদের প্রিয় এ ফুলগুলোর জন্ম বাংলাদেশে নয়। কৃষ্ণচূড়ার জন্মভূমি পূর্ব আফ্রিকার মাদাগাস্কারে। আর রাধাচূড়ার আদিনিবাস ওয়েস্ট ইন্ডিজে। তাতে কী। কত অতিথিকেই তো আপন করে নিয়েছে বাঙালি।
দেশের প্রকৃতিতে গ্রীষ্মকাল মানেই বাহারি কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া ফুল। রাস্তার মোড়ে মোড়ে কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া মনকাড়া গাছ। সবুজ সবুজ চিকন পাতা। ফাঁকে ফাঁকে লাল ও হলুদ কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া ফুল। দেখলেই যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। মন নেচে ওঠে আনন্দে। রাধাচূড়া তেমন দেখা না মিললেও কৃষ্ণচূড়া প্রায়ই দেখা যায়। কৃষ্ণচূড়া চমৎকার পত্রপল্লব এবং আগুনলাল এর জন্য বিখ্যাত।
ভিনদেশি এ ফুলের বৃক্ষগুলো আমাদের দেশে এসে নতুন নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। শ্রীমতী রাধা শ্রীকৃষ্ণকে ভালোবেসেছিলেন; তা মানবিক বা ঐশ্বরিক যে অর্থেই হোক না কেন। এই ভালোবাসায় রাধার আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা কম ছিল না। তবুও শ্রীকৃষ্ণ তাকে ফেলে গোকুল ছেড়ে গিয়েছিলেন। রাধা-কৃষ্ণের এই প্রেম আখ্যান এখনও অমর হয়ে আছে। যেহেতু কৃষ্ণ একজন পৌরাণিক পুরুষ, তাই ধারণা করা হয় কৃষ্ণের মাথায় চুলের-চূড়া বাধার ধরন থেকেই নামকরণ করা হয় কৃষ্ণচূড়ার। রাধাচূড়ার ক্ষেত্রেও মতবাদ প্রায় একই। শ্রীমতী রাধাকে আরও অমর করে রাখতেই পুরাণের রাধাকে বাস্তবের পুষ্পজগতে স্থান দেওয়া হয়। লাল ও হলুদ রঙের কমনীয় এ ফুলের মধ্যেই অনুরাগীরা খুঁজে পান তাদের কাঙ্ক্ষিত রাধাকে। ধারণা করা হয়, রাধা ও কৃষ্ণের নাম মিলিয়ে এ বৃক্ষগুলোর নাম হয়েছে কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া। এর বড় খ্যাতি হলো গ্রীষ্মে যখন এই ফুল ফোটে, এর রূপে মুগ্ধ হয়ে পথচারীরাও থমকে তাকাতে বাধ্য হন। কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া গাছ উচ্চতায় খুব বেশি হয় না; সর্বোচ্চ ১২ মিটার। তবে এর শাখা পল্লব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো থাকে।
তরুণ সাংবাদিক ও স্বাধীন চেতনার প্রজন্ম ফাউন্ডেশনের সভাপতি ফরহাদুল ইসলাম বলেন, বাড়ির পাশে এ অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে কতই না ভালো লাগে। কিন্তু বৃক্ষ নিধনের শিকার হয়ে দিন দিন কমে যাচ্ছে আনোয়ারা থেকে রঙিন এই গাছগুলো। একসময় এ গাছ হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষ ও প্রকৃতির স্বার্থেই বেশি করে কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।