৪৫ কোটির পরিচ্ছন্ন অভিযানের পরও ডুবছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা : দায়ী অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

বর্ষা এলেই যেন একই চিত্র। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায় চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৪০টি খাল খনন ও ৭৮৫টি নালা পরিষ্কারে ৪৫ কোটি টাকার বিশেষ কর্মসূচি চলমান থাকলেও, বাস্তবে সেই প্রস্তুতির বড় অংশই ভেস্তে যাচ্ছে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্বল তদারকি এবং নাগরিক অসচেতনতার কারণে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নগরীর বিভিন্ন খাল ও নালা থেকে উত্তোলিত পলিথিন, প্লাস্টিক, কাদা ও অন্যান্য বর্জ্য দিনের পর দিন খালের পাড়েই ফেলে রাখা হচ্ছে। কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে সেসব বর্জ্য আবার খাল-নালায় নেমে গিয়ে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে আগ্রাবাদের মিস্ত্রিপাড়া, মেমগলি, আসকারাবাদসহ বিভিন্ন নিচু এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের অপেক্ষা না করে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের অর্থে শ্রমিক নিয়োগ করে নালা পরিষ্কার করেন।
শুধু খাল-নালার বর্জ্যই নয়, নগরজুড়ে ডাস্টবিনের সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নব্বইয়ের দশকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত ডাস্টবিনগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হয়। পরে কিছু এলাকায় নতুন ডাস্টবিন বসানো হলেও নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় সেগুলো কার্যকর থাকেনি। অনেক ডাস্টবিন ভাঙচুর ও চুরির শিকার হয়েছে। এমনকি প্লাস্টিকের ডাস্টবিনে আগুন দিয়ে তা নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক ভবনের বাসিন্দা জানালা ও বারান্দা থেকে সরাসরি নিচে আবর্জনা ফেলছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পেছনের গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় ওপর থেকে বর্জ্য পড়ে অল্পের জন্য দুর্ঘটনা এড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। অঙ্েিজন মোড়ের কয়েকটি খাবারের দোকানের বিরুদ্ধে ম্যানহোলের ছিদ্র দিয়ে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এসব বর্জ্য শেষ পর্যন্ত ড্রেন ও খালে গিয়ে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই। যেখানে আছে, সেখান থেকেও নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা হয় না। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে, খোলা জায়গায় কিংবা খালের ধারে বর্জ্য ফেলছে। অনেকের মতে, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, দিনে অন্তত দুইবার বর্জ্য অপসারণ এবং যেখানে-সেখানে ময়লা ফেললে জরিমানার বিধান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “ডাক্তার আসার আগেই রোগী মারা গেল। খাল খনন ও নালা পরিষ্কারের কাজ শুরু হওয়ার পরপরই অতিভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়।” তিনি জানান, চট্টগ্রামের বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা ১২০ থেকে ১৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা রাখলেও এবার প্রায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সঙ্গে খালের তুলনায় স্লুইসগেটের প্রস্থ কম হওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, পরিচ্ছন্ন বিভাগে ৩ হাজার ১৫০ জন কর্মী থাকলেও তিন শিফটে দায়িত্ব পালনের কারণে প্রতিটি শিফটে জনবল অনেক কমে যায়। একই সঙ্গে সড়ক পরিষ্কার, মশকনিধন এবং বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহের কাজ করায় নিয়মিত সব ড্রেন পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না।
চসিক সূত্র জানায়, ৪৫ কোটি টাকার কর্মসূচির আওতায় ৪০টি খাল ও ৭৮৫টি নালা পরিষ্কারের কাজ চলছে। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের চারটি প্রকল্পে মোট প্রায় ১৪ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়নাধীন। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি ২১টি খাল সংস্কারে আরও ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকার দুটি নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ: ‘জলাবদ্ধতার মূল কারণ দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার জন্য শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়; দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাল-নালা দখল, পাহাড় কাটা, জলাধার ভরাট এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতাই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য বিভিন্নভাবে ড্রেন ও খালে গিয়ে পড়ে। বিশেষ করে পলিথিন ও প্লাস্টিক পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
তার মতে, উন্মুক্ত ডাস্টবিন তুলে দিয়ে ডোর-টু-ডোর বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নীতিগতভাবে সঠিক হলেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। একই সঙ্গে আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও রিসাইক্লিং ব্যবস্থার ঘাটতিও সংকট বাড়িয়েছে।
ড. ইকবাল সরোয়ার বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও পরিকল্পনার ত্রুটি, ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের অসম্পূর্ণতা, প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সিডিএ, চসিক, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়হীনতার কারণে সাধারণ মানুষ এখনো কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে খাল খননের পর উত্তোলিত বর্জ্য ও কাদা সময়মতো অপসারণ না করায় তা আবার বৃষ্টির পানিতে খালে ফিরে গিয়ে পুরো কার্যক্রমকে অকার্যকর করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর একই খাল-নালা পরিষ্কারে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়া বর্তমান বর্জ্য ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রমাণ। স্থায়ী সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, আধুনিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা চালু, ৩৯টি স্লুইসগেট ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প সচল রাখা, পাহাড় কাটা বন্ধ, খালের মুখে নিয়মিত সিল্ট ট্র্যাপ পরিষ্কার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেন।
তার ভাষায়, “চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার মূল কারণ এককভাবে অতিবৃষ্টি নয়, দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে বেশি দায়ী। কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে আগামী বছরগুলোতেও একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”