বন্যাদুর্গতদের পুনর্বাসনে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার : অর্থমন্ত্রী

ভয়াবহ বন্যায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ| সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় স্মরণকালের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় সাত লাখ মানুষ পানিবন্দি ছিলেন| আকস্মিক এই মানবিক বিপর্যয়ে দুর্গত মানুষের পাশে একযোগে এসে দাঁড়িয়েছে সরকার ও দেশের ব্যবসায়ী সমাজ| গতকাল শুক্রবার দিনভর চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এবং বাঁশখালীর সরলসহ বিভিন্ন দুর্গত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী| এ সময় তিনি সরকারি ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন|
পরিদর্শনকালে বন্যাকবলিত প্রান্তিক মানুষের মাঝে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, এখন শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, সরকারের মূল লক্ষ্য বন্যাদুর্গতদের দ্রুত পুনর্বাসন করা| পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বাসনের এই সর্বাত্মক কার্যক্রম একযোগে চলবে|
গতকাল দুপুরে সাতকানিয়ায় তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত খাদ্য ও জরুরি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী| দুর্যোগকালীন মুহূর্তে ব্যবসায়ীদের এমন মানবিক ও অগ্রণী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, যেকোনো দুর্যোগের কঠিন সময়ে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং দেশের ব্যবসায়ী সমাজের ভূমিকা সবসময়ই প্রশংসনীয়| তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতি যেভাবে বানভাসি অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তা মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে|
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ও তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, সুখে-দুঃখে তামাকুমন্ডি লেইনের ব্যবসায়ীরা সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন এবং আছেন| আগামীতেও যেকোনো সামাজিক ও মানবিক সংকটে এই সেবামূলক ধারা অব্যাহত থাকবে| এ সময় চসিক মেয়র ও স্থানীয় সংসদ সদস্যরা বন্যাকবলিত নিজ নিজ এলাকার মানুষের পাশে থেকে ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গতিশীল করতে প্রশাসনের সাথে সমš^য় করে কাজ করার ঘোষণা দেন|
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার পাশাপাশি গতকাল বাঁশখালী উপজেলার সরল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী| সেখানে বন্যাদুর্গতদের মাঝে তিনি সরকারি ও ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন| বাঁশখালীর স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে মন্ত্রী বলেন, দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে সরকার সাধারণ মানুষকে একা ছেড়ে দেবে না| দ্রুত পরিস্থিতিস স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে|
এর আগে শুক্রবার দুপুরে লোহাগাড়া উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী| দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন, তবে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে| ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারের ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং একই সাথে পুনর্বাসন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে, যা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে| সরকারি সহায়তার বিবরণ দিয়ে মন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ৪০ হাজার পরিবারকে চাল, ৭৫ হাজার পরিবারকে চাল-ডালসহ শুকনা খাবার এবং ৪০ হাজার পরিবারকে রান্না করা খাবার দেওয়া হয়েছে| প্রয়োজন অনুযায়ী এই ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে| তিনি আরও বলেন, যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে টিন সরবরাহ করা হচ্ছে| কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দেওয়া হবে, যাতে পানি নেমে যাওয়ার পরপরই তারা দ্রুত চাষাবাদে ফিরতে পারেন| এছাড়া বন্যায় অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত করায় স্থানীয় সরকার বিভাগকে ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মূল্যায়ন শেষে অতিসত্বর মেরামত কাজ শুরু হবে|
বন্যার মূল কারণ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে সম্বতিভাবে তদন্ত চলছে| কোথাও রেল লাইন, কোথাও অপরিকল্পিত স্থাপনা কিংবা পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে এই কৃত্রিম বন্যা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে| বিশেষ বরাদ্দের বিষয়ে তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন শেষে সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে|
উপকূলীয় ও পাহাড়ি জনপদ পরিদর্শনের এই বিশেষ কার্যক্রমে অর্থমন্ত্রীর সাথে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার সাংসদ শাহজাহান চৌধুরী, বাঁশখালীর সাংসদ জহিরুল ইসলাম, চন্দনাইশ এলাকার সাংসদ জসিম উদ্দিন এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা| দুর্যোগের এই ক্রান্তিকালে নিজ নিজ আসনের জনগণের পাশে সাংসদদের এই উপস্থিতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ স্থানীয় প্রশাসন ও উপদ্রুত মানুষের মাঝে বড় ধরনের সাহস ও আশার আলো জুগিয়েছে|
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী (পাপ্পা) এবং দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল নাঈম রিকু| এছাড়া ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন তামাকুমন্ডি লেইন বণিক সমিতির সভাপতি আবু তালেব ও সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক| মন্ত্রীর এই বিশেষ সফরে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাংসদ এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সাংসদ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১২ আসনের সাংসদ এনামুল হক এনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দীনসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ|
##