২০২৩ সালে বিএনপির রাজনীতি: আন্দোলন-কূটনীতিতে সরব থেকেও নিষ্ফল

শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের ভেতর দিয়ে বছরটি কাটাতে হয়েছে

-ড. মঈন খান, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি

 

কথায় বলে ‘যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ’। অর্থাৎ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষের মনে হয় বর্তমানের চেয়ে আগের দিনগুলো ভাল ছিল। বিএনপি প্রায় এক যুগের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আরো একটি বছর পার করল। নি:সন্দেহে বিগত বছরগুলোর তুলনায় ২০২৩ সাল ছিল দলটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বের হওয়ায় এই বছরটিতে আন্দোলনের দাবি আদায়ে ব্যাপক সোচ্চার ছিল বিএনপি। তৎপরতার অংশ হিসেবে পদযাত্রা, অবস্থান কর্মসূচি, গণ-মিছিল ও রোডমার্চসহ নানাবিধ কর্মসূচি পালন করেছে। মূলত বছর জুড়েই আন্দোলনমুখী ছিলো বিএনপিসহ সমমনা জোটগুলো। বছর যত শেষের দিকে এগিয়েছে, বিএনপির আন্দোলনের হুংকার তত জোরালো হয়েছে। কিন্তু ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের পর রাজনীতির মাঠ আরো গরম হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলেও বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের গ্রেপ্তারের কারণে উল্টোটা হয়েছে। অবরোধ-হরতালের ডাক দিলেও পালন হয়েছে নামসর্বস্ব। আর বছরের শেষ দিন গতকাল পর্যন্ত আন্দোলন ছিল নিস্ফল। ৬ দিন পরেই ভোট গ্রহন। রাজনীতির মহলে প্রশ্ন উঠেছে, আরো একটি বছর পেরিয়ে গেল। কি হবে বিএনপির আন্দোলনের ভবিষ্যৎ। আন্দোলন ফলপ্রসূ করতে নতুন বছরে দলটি পুরানো পথেই হাটবে নাকি নতুন কোন পরিকল্পনা নিয়ে এগোবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০২৩ সালটি বিএনপির জন্য ছিল ঘটনাবহুলএ যে ঘটনার শুরু হয় ’২১ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশের মধ্য দিয়ে। ২০২৩ সালকে চূড়ান্ত আন্দোলনের বছর হিসেবে টার্গেট করে আগের বছর ১২ ডিসেম্বর ভেঙে দেওয়া হয় ২০ দলীয় জোট। এরপর থেকে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে জোট শরিকরা। শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে পদযাত্রা, অবস্থান কর্মসূচি, গণমিছিল ও রোড মার্চ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন হওয়ার পর চলতি বছরের ১২ জুন সরকার পতনের একদফা আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। একদফা ঘোষণা দেওয়ার পর কয়েকটি কর্মসূচি পালনের পর ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয় দলটি। মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে কঠোর হয়ে ওঠে সরকার। মহাসমাবেশ ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পরদিন থেকে দফায় দফায় হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে দলটি ও তার মিত্ররা। ১২ দফায় ২৩ দিন অবরোধ এবং ৪ দফায় পাঁচ দিন হরতাল পালন করে বিএনপি। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, ২৮ অক্টোবর থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে মোট ২৯৮টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে তিন শতাধিক যানবাহন ও ১৭টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্নিসংযোগকৃত যানবাহনের মধ্যে বাস ১৯৫টি, ট্রাক ৪৫টি, কাভার্ডভ্যান ২৩টি, মোটরসাইকেল ৮টি ও অন্যান্য ২৯টি গাড়ি রয়েছে। এসব ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা করে পুলিশ। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে র‌্যাব-পুলিশ। শুরুতেই দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর একে একে মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জহির উদ্দিন স্বপন, মজিবুর রহমান সারোয়ারসহ বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যায় মাঠে সক্রিয় থাকা দলটির বহু নেতাকর্মী। মহাসমাবেশ পুলিশ ও সরকার দলীয় বাধায় পণ্ড হওয়ার পর চলতি বছর প্রকাশ্যে আর কোনো সভা-সমাবেশ করতে পারেনি দলটি। সরকার পতনের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেয় বিএনপিসহ অন্তত ৬০টি দল। দফায় দফায় হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করে নির্বাচনের ঠিক ১৭ দিন আগে ২০ ডিসেম্বর অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয় বিএনপি। অসহযোগ আন্দোলনে বিএনপির মিত্ররাও সমর্থন জানিয়েছে।

এছাড়া, বছর জুড়ে কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে বিএনপি। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকারের দেওয়া সংলাপ প্রত্যাখান করে দলটি। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন অংশ নেওয়ার বহিষ্কার করা হয় দলটির অসংখ্য নেতাকর্মীকে। এর আগে বহিষ্কার হওয়া নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনার কথা থাকলেও তা প্রত্যাহার করা হয়নি। বছরের শেষ দুই মাস হরতাল-অবরোধেই ছিল বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো।

২০২৩ সালের রাজনীতি প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেন, একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের ভেতর দিয়ে বছরটি কাটাতে হয়েছে বাংলাদেশের ভিন্ন মতাবলম্বীদের। বিগত বছরে নতুন করে জীবন দিতে হয়েছে ২২ জনকে যারা বছরব্যাপী সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ভেতরেও সরকারের আক্রোশের শিকার হয়েছেন।