দেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিতর্কিত, উস্কানিমূলক ও ভিত্তিহীন নানা মন্তব্য করে বিএনপির পলাতক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজনৈতিক সহিংসতা উসকে দিচ্ছেন বলে মনে করছেন অধিকারকর্মী ও সংখ্যালঘু নেতারা। গত ২৮ অক্টোবর দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নেমে বিক্ষোভের ডাক দেন তারেক রহমান, যিনি বেশ কয়েকটি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত। সরকার উৎখাতে তার অগণতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক এ ডাকে জনমনে তৈরি হয় আতঙ্ক। অধিকারকর্মী ও সংখ্যালঘু নেতারা বলছেন, ২৮ অক্টোবরের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির নামে নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। অভিযোগ রয়েছে, তারেক রহমানের নির্দেশেই এসব নাশকতা চালাচ্ছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।
তারেকের এমন অবস্থান এবং চলমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে, যুদ্ধাপরাধ বিরোধী ও মানবাধিকার কর্মী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা সংখ্যালঘু এবং উদারপন্থি শক্তির বিরুদ্ধে নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, চলমান হামলা-নাশকতায় তারেক রহমান তার দলের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে মূলত আওয়ামী লীগকে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন।
‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উস্কানি’
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেছেন, ‘প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আমরা নাগরিকদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করাকে আমাদের দায়িত্ব হিসেবে দেখি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান এ বিষয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, ন্যায়বিচার থেকে পালিয়ে লন্ডনে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করছেন তারেক রহমান। তিনি বিএনপির নেতা এবং একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। একজন দণ্ডিত অপরাধী এখন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।’
‘ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা বিএনপির দায়িত্ব’ – তারেকের এমন মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার প্রতিটি রাজনৈতিক দলের রয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রবিরোধী দলকে প্রতিবাদের নামে অপরাধ করার লাইসেন্স দেয়া হয় না।’
মিজানুর রহমানের মতে,
ডিপ্লোম্যাটকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারেকের ‘অভ্যুত্থানের’ আহ্বান বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে – আদতে যা ক্ষতির কারণ হবে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মেসবাহ কামালের ভাষ্য, ‘জনসাধারণের ম্যান্ডেট নিয়ে ব্যালট পেপার বা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই কেবল সরকারের পরিবর্তন করা যেতে পারে।’
বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড পেজে দণ্ডিত তারেক রহমানের একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়েছিল। সেখানে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যাবে কোন পথে, ফয়সালা হবে রাজপথে’। তারেকের ‘রাজপথে ফয়সালা’র এ ডাক প্রসঙ্গে মেসবাহ কামাল বলেন, ‘জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া আপনারা কোনো পরিবর্তন আনতে পারবেন না। বিএনপি ও জামায়াতের অতীত রেকর্ড সহিংস; ফলে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।’
এ বিষয়ে লেখক, ইতিহাসবিদ ও গবেষক শাহরিয়ার কবির বলেছেন, ‘ব্যালটের লড়াইয়ের পরিবর্তে ক্ষমতা দখলের জন্য সরকার উৎখাতের জন্য বিএনপি রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, যা অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজপথে ফয়সালা নেয়ার সিদ্ধান্ত সম্বলিত আহ্বান সংবিধানকে অবজ্ঞা করার শামিল। বিএনপি নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন, তারা সংবিধানকে তোয়াক্কা করেন না।’
‘সহিংসতার ছক’
এদিকে, গত ১৮ ডিসেম্বর ডিপ্লোম্যাটে তারেক রহমানের ওই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বিএনপি নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা তা সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার করা শুরু করেন। এরপর বিএনপি এবং সমমনা বিরোধী দলগুলোর ডাকা হরতাল শুরু হওয়ার ঠিক আগে ১৯ ডিসেম্বর ভোরে হরতালকারীরা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দিলে তিনটি বগি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
ভোর ৫টা ৪ মিনিটে খবর পেয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টার পর পৌনে ৭টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে পুড়ে যাওয়া একটি বগি থেকে মা-ছেলেসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরা হলেন: নাদিরা আক্তার পপি (৩৫) ও তার ছেলে ইয়াসিন (৩), রশিদ ঢালী ও খোকন।
গত ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ ঘিরে বিএনপি আরও আগে থেকেই সহিংসতার ছক আঁকে। সেই ধারাবাহিকতায় ঢাকার বাইরে থেকে আসে বোমার কারিগর, আর গান পাউডার আসে কুমিল্লা থেকে!