এবার ডিসেম্বরে চোখ বিএনপির
# আন্দোলন জমানোর নতুন পরিকল্পনা # দ্রব্যমূল্য-দুর্নীতি ইস্যুতে গণজমায়েত # প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে -নজরুল ইসলাম খান, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি
মুনিরুল তারেক:
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের বড় অংশ নির্বাচনে যাচ্ছে। বাধাহীনভাবেই এগুচ্ছে সব ধরনের প্রস্তুতি। অন্যদিকে, বিএনপির নেতৃত্বে নির্বাচন ঠেকানোর মিশনে রাজপথে রয়েছে একটি পক্ষ। তবে অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি পালন ও বিভিন্ন আল্টিমেটাম দিলেও সময় গড়াচ্ছে। পাত্তা পাচ্ছে না ‘সরকার পদত্যাগের’ দাবি। এ অবস্থার মধ্যে বিএনপির নতুন টার্গেট ডিসেম্বর।
৩০ নভেম্বর নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন। যাচাই-বাছাই হয়ে ৩০ তারিখের পরই মোটামুটি চূড়ান্ত হবে দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থিতা। এরপর ডিসেম্বরজুড়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার মধ্যেই আন্দোলন জমাতে চায় বিএনপি। ডিসেম্বরের আন্দোলনে চলমান ধারায় পরিবর্তন এনে মানুষের জীবন-জীবিকা সংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে কর্মসূচি দেয়ার পরিকল্পনা করছে দলটি। যেমন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ভোট দিতে না পারা, দুর্নীতি ইত্যাদি। বিএনপি মনে করছে, এই বিষয়গুলো সামনে এনে কর্মসূচি দিলে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও তাতে অংশ নেবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতির চাপ রয়েছে। অর্থনৈতিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মত বৈদেশিক চাপের কথাও শোনা যাচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তফসিল ঘোষণার পরই নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে। অতীতের দুটি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগামী ভোট নিয়ে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। কে কোথায় মনোনয়ন পেল, কে কেন বঞ্চিত হল, দলীয় মনোনয়নের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী কে কে হচ্ছে- এসব প্রশ্নে জমে উঠেছে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাসা-বাড়ির ডায়নিং টেবিলের আলোচনা। পাশাপাশি, নির্বাচনমুখি দলগুলোর কার্যালয় নেতা-কর্মীদের ভিরে মূখর থাকছে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত।
বিপরীতে, নির্বাচনের বাইরে থাকা বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় তালাবদ্ধ প্রায় এক মাস। অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা কারাগারে। গ্রেপ্তার এড়িয়ে থাকা বাকি নেতারা লাপাত্তা। লুকিয়ে থাকা জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রতিদিন গণমাধ্যমে ভার্চুয়ালি ব্রিফ করছেন। ছুটি ও বিরতি বাদে সপ্তাহের চার দিন সর্বাত্মক অবরোধ অথবা হরতালের ঘোষণা হচ্ছে। তবে, সেই ‘সর্বাত্মক’ কর্মসূচি পালন হচ্ছে চোরাগোপ্তা মিছিলের মধ্য দিয়ে। সরকার পতনের মত গুরুতর আন্দোলনে কেন এই ঢিমেতাল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল- কর্মসূচির ডাক দিয়ে নেতা-কর্মী ও দেশবাসীকে আন্দোলনের পক্ষে দৃঢ় থাকার জানান দিচ্ছে বিএনপি। প্রবাসে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এবং লুকানো নেতারা নিয়মিত আভ্যন্তরীণ ও আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছেন। চলমান নির্বাচনী হাওয়ার মোকাবিলায় কিভাবে ‘আন্দোলনের ঘূর্ণিঝড়’ তোলা যায়, সেই পরিকল্পনা করছে দলটি। পাশাপাশি, আন্দোলনের সহায়ক ভূমিকায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অবহিত করছে তাদের। এই মুহূর্তে বিএনপির মূল লক্ষ্য- যে কোনভাবে ৭ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকানো।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন ঠেকাতে সারাদেশে সংসদীয় আসনভিত্তিক জোরদার আন্দোলন করার পরিকল্পনা করছে বিএনপি। ৩০ নভেম্বর সব আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত হবে। ফলে ডিসেম্বর মাসকে গুরুত্ব দিয়ে বহুমুখি কর্মসূচির কথা ভাবছে। সেই ধারাবাহিকতায় নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতারা ডিসেম্বর থেকে নিজেদের কর্মী-সমর্থক নিয়ে রাজপথে সরব হবেন। নিজ নির্বাচনী এলাকায় যারা আন্দোলন জমাতে পারবেন তারাই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক পাবেন। গত ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশে সংঘাতের পর মামলা, গ্রেপ্তার, সাজায় দিশেহারা বিএনপি। চলছে ধারাবাহিক হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি। সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বাড়িঘরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চিরুনি অভিযানে এক দফা আন্দোলনে কিছুটা ভাটা পড়েছে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য জানান, গ্রেপ্তার এড়াতে নেতা-কর্মীরা বনে-জঙ্গলে রাত কাটাচ্ছে। সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মোকাবিলা করতে গিয়ে তাদের টালমাটাল অবস্থা। অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চলমান হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি বাদ দিয়ে পদযাত্রা ও ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি আসতে পারে। অথবা চলমান কর্মসূচির মধ্যেই কৌশলে পরিবর্তন এনে জনস্বার্থ বিষয়ক ইস্যুতে কর্মসূচি দিয়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ঘটাতে পারে বিএনপি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ডিসেম্বরকে দুই ধাপের কর্মসূচিতে সাজানো হয়েছে। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিল শেষ হলে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে নেতাকর্মীদের রাজপথে তৎপর রাখা হবে। এরপর সপ্তাহখানেক আবার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি করবে। ওই সময়ে দায়িত্বশীল নেতাদের কৌশলে গ্রেপ্তার এড়াতে বলা হয়েছে। তবে নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর আর রাকঢাক মানবে না। কর্মসূচি পালনে ঝাপিয়ে পড়তে নির্দেশনা দেয়া হবে। যার ভূমিকা যতটা প্রভাব বিস্তার করবে, দলের সাংগঠনিক পর্যায় অথবা মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা জানান, নির্বাচনে অংশ নেয়ায় ইতোমধ্যে কয়েকজনকে বহিস্কার করা হয়েছে। আন্দোলনের সঙ্গী বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিসহ তিনটি দল নির্বাচনে যাওয়ায় তাদেরকে ১২ দলের কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আরো কিছু নাম শোনা যাচ্ছে যারা বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচনের পক্ষে রয়েছে। দল বা যুগপৎ আন্দোলনের এমন সন্দেহভাজনদের অবস্থান প্রতীক বরাদ্দের পর স্পষ্ট হবে। এক দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনের নীতির বাইরে থাকা যে কারো বিরুদ্ধে কঠোর হবে বিএনপি। এছাড়া, ৩০০ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ৩ হাজার ৩৬২ জন। প্রতি আসনে গড়ে ১০ জন করে মনোনয়ন পাবেন না। এই বঞ্চিতদের অনুসারী নেতা-কর্মীদের অসন্তোষ নির্বাচন ঠেকানোর কাজে লাগানোর চেষ্টার কথাও ভাবছে বিএনপির হাইকমান্ড।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে। মামলা-গ্রেপ্তারের মধ্যে নেতা-কর্মীরা কর্মসূচি পালন করছে। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে।