উপমহাদেশের গণসংস্কৃতি আন্দোলনের প্রবাদ প্রতিম শিল্পীসংগ্রামী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম ১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার চুনারুঘাটের মিরাশী গ্রামে। জমিদার পিতার সন্তান হয়েও রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং অঙ্গীকারে শ্রেণির সীমানা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন তিনি। পরিবারে গানের চর্চা ছিল না। তবে তার নানা ছিলেন সে সময়কার নামকরা তবলা বাদক। মা সরোজিনী বিশ্বাস গান জানতেন এবং গান করতেন। শৈশবে স্কুলে যাওয়ার পথে গান গেয়ে গেয়ে স্কুলে যেতেন- যদিও প্রাতিষ্ঠানিক গান শেখা তার হয়নি।
জ্যোতিপ্রকাশ আগারওয়ালের কাছ থেকেই নিয়েছিলেন গানের তালিম। গানের ক্ষেত্রে সেটাই ছিল তার একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। শৈশব থেকেই লোকসঙ্গীত চর্চা করতেন বলেই লোকসঙ্গীতে অসামান্য দখল ছিল তার। লোকসঙ্গীতের আবহ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে যাওয়া যায়- তাই লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে জীবনভর গণমানুষকে উজ্জীবিত করতে গেয়েছেন গণসঙ্গীত। প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করতেই গান রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেনও।
কলেজছাত্র হেমাঙ্গ বিশ্বাস জড়িয়ে পড়েন স্বদেশি আন্দোলনে। এ কারণে তাকে ৬ মাস কারাভোগ করতে হয় এবং বহিস্কৃত হতে হয় কলেজ থেকে। স্বদেশি আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের অপরাধে ১৯৩২ সালে আবার গ্রেফতার হয়ে একটানা প্রায় তিন বছর কারাভোগ করেন। তখনই আক্রান্ত হন মারাত্মক যক্ষ্মা রোগে। বন্ড দিয়ে জেলমুক্তির রাষ্ট্রীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও মৃত্যৃ নিশ্চিত ভেবে ব্রিটিশ সরকার তাকে মুক্তি দিয়ে দায়মুক্তি নিয়েছিল। যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে দীর্ঘ তিন বছর চিকিৎসা শেষে সুস্থ হন। জেল জীবনে কংগ্রেসের অহিংস নীতির প্রতি আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে মার্কসবাদী রাজনীতির শিক্ষা-দীক্ষায় কমিউনিস্ট মতাদর্শে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি নেতাজি সুভাষ বসু হবিগঞ্জে এলে তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনাপত্র পাঠ করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। চা বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং ডিকবয় তেল কোম্পানির শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৪২ সালের ১৮ জুলাই কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে সিলেট শহরের গোবিন্দচরণ পার্কে সাংস্কৃতিক স্কোয়াড ‘সুরমা ভ্যালি কালচারাল স্কোয়াড’ গঠন করেন। মানবমুক্তির লক্ষ্য অর্জনে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেকে। সিলেট কমিউনিস্ট পার্টি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সংগঠন গড়ে তুলতে তাকে পাঠায়। সে সময়ে রচিত তার বিখ্যাত গান-‘কাস্তেটারে দিও জোরে শান।’
১৯৪৬ সালে আসাম প্রদেশ গণনাট্য সংঘ গঠিত হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরপর তিনবার ওই পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৭-এ গণনাট্য সংঘ এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা দেশভাগের শিকার হন। দেশভাগের নিষ্ঠুর পরিণতিতে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ব্যঙ্গাত্মক গান- ‘মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য’ দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছিল। ১৯৪৮ সালে তেলেঙ্গানা ও তেভাগা কৃষক বিদ্রোহ দমনে স্বাধীন ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। হাজার হাজার কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন-পীড়ন এবং গণগ্রেফতার করা হয়। ১৯৫১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গ্রেফতার হলেও অসুস্থতার কারণে ছাড়া পেয়ে যান। ১৯৫৭ সালে সুচিকিৎসার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে তাকে চীনে পাঠানো হয়। টানা তিন বছর চীনে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় চীনা ভাষাও রপ্ত করেছিলেন। চীনা ভাষায় তার অনেক গানও রয়েছে। চীন থেকে ফিরে ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রামের মেয়ে রাণু দত্তকে বিয়ে করেন। পরে আরও কয়েকবার তিনি চীনে গিয়েছিলেন। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিপ্রধান কমরেড মুজাফ্ফর আহ্মদের সুপারিশে কলকাতাস্থ সোভিয়েত কনস্যুলেটে ১৯৬১ সালে তার চাকরি হয়। পরবর্তীতে চীন-সোভিয়েত মতাদর্শগত বিভাজনে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনও বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার বিরূপ প্রভাব আমাদের উপমহাদেশেও পড়েছিল। চীনের প্রতি তার অতি আকর্ষণ এবং সোভিয়েত পার্টির সমালোচনার কারণে ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত কনস্যুলেটের চাকরি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৬৯ সালে নকশাল বাড়ি আন্দোলনের প্রতি তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন প্রদান করেছিলেন। নকশাল আন্দোলন ভারতীয় শাসক শ্রেণিকে আতঙ্কে দিশাহারা করে তুলেছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সুযোগের মওকায় ভারত সরকার সুকৌশলে এবং চরম পন্থায় নকশাল আন্দোলন দমনে সফল হয়েছিল। ১৯৭১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গঠন করেন ‘মাস সিঙ্গার্স’ নামক গণসঙ্গীতের গানের দল এবং আমৃত্যু এই দল নিয়েই ঘুরে বেড়িয়েছেন ভারতজুড়ে এবং দেশ-বিদেশে। ২২ নভেম্বর ১৯৮৭ আজন্ম বিপ্লবী-অবিচল মতাদর্শিক হেমাঙ্গ বিশ্বাস কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গানের সংকলনÑ বিষাণ, চীন দেখে এলাম, ডরঃহবংংরহম ঈযরহধ রিঃয ঊুবং, সীমান্ত প্রহরী, অসমীয়া ভাষার কাব্যগ্রন্থ কুলখুরার চোতাল, অসমীয়া ভাষায় আকৌ চীন চাই আহিলোঁ (দ্বিতীয় খণ্ডে), গান ও স্বরলিপি সংকলন শঙ্খচিলের গান, আবার চীন দেখে এলাম, লোক সঙ্গীতের সমীক্ষা : বাংলা ও আসাম, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান, জীবন শিল্পী, জ্যোতিপ্রকাশ। মৃত্যুর পর প্রকাশিত আত্মজীবনী উজান গাঙ বাইয়া ইত্যাদি। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে- কাস্তেটারে দিও জোরে শান, তেলেঙ্গানা-তেলেঙ্গানা, জন ব্রাউন-এর দেহ শুয়ে সমাধিতলে, আমি যে দেখেছি সেই দেশ (চীন নিয়ে), মার্কিন লোকসঙ্গীতশিল্পী পিট সিগারের আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের বঙ্গানুবাদ- আমরা করব জয়, অজ্ঞাতনামা মার্কিন লোকসঙ্গীত- জন হেনরি (আমেরিকার রেললাইন পাতার শ্রমিকদের নিয়ে), বাজে ক্ষুব্ধ ঈশানী ঝড়ে রুদ্র বিষাণ (১৯৪৬-এর নৌ বিদ্রোহ নিয়ে), নিগ্রো ভাই আমার পল রবসন, হিরোশিমায় আণবিক বোমা বর্ষণ নিয়ে- শঙ্খচিল, প্রহসনের স্বাধীনতা নিয়ে- আজাদী হয়নি আজও তোর, মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য, মাও সেতুং স্মরণে- আরও বসন্ত-বহু বসন্ত তোমার নামে আসুক, নোঙর ছাড়িয়া নাও-এর দে দুঃখী নাইয়া, বেহুলার ভেলায় যায় ভেসে যায়, তোর মরা গাঙ্গে আইলো এবার বান, জালিয়ানওয়ালাবাগের-জালালাবাদের এসেছে আদেশ (সুর দেবব্রত বিশ্বাস), পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে- হায় হায় ঘোর কলিকাল আইলো আকাল, খাদ্য আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে- গুলিবিদ্ধ গান যে আমার খুঁজে খুঁজে মরে, মুক্তির শিবিরে হাঁকে বিউগল।
নাটক, যাত্রা এবং চলচ্চিত্রে সুর দিয়েছেন- সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। উৎপল দত্তের কল্লোল ও তীর নাটক উল্লেখযোগ্য।