বিএনপির সমান্তরালে জামায়াত!
* আন্দোলনের শরিক না হয়েও পালন করছে একই কর্মসূচি * অনুমতি না নিয়েও বাধাহীন কর্মসূচি পালন নিয়ে কৌতুহল
বিএনপির সঙ্গে জোটে নেই জামায়াত ইসলামী। আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ খুব একটা রয়েছে বলে স্পষ্ট নয়। একদফা দাবির আন্দোলনে প্রায় ৪০টি দল শরিক হলেও জামায়াত থেকেছে নীরব। তবে বিএনপির আন্দোলন জমে উঠতেই তাদের কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে একক কর্মসূচি ঘোষণা করছে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক সংগঠনটি। ২৮ অক্টোবর তারাও মহাসমাবেশ করেছে। পরের দিন হরতাল এবং আজ থেকে তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচিও বিএনপির সঙ্গে মিল রেখেই দিয়েছে সংগঠনটি।
এদিকে, বিএনপির সমান্তরালে পৃথক আন্দোলন করলেও জামায়াতের অবস্থান রহস্যঘেরা। প্রায় ১০ বছর পর সরকারের অনুমতি নিয়ে কর্মসূচি পালন, প্রশাসনের নিষেধ সত্ত্বেও মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর সমাগম ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে মহাসমাবেশ করাকে রাজনীতিতে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন করে বিএনপিকে খুশি রাখা না-কি সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচনে যাওয়া- পর্দার আড়ালে কী করছে জামায়াত ইসলামী? তা নিয়ে কৌতুহল বাড়ছে।
অতীতে দেখা গেছে, যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকায় বিএনপিকে কথা শুনতে হয়েছে অনেক। জামায়াতের রাজনীতিতে সহিংসতা-নাশকতার স্বীকৃত ইতিহাস থাকায় কিছু বিদেশি রাষ্ট্র দলটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মানে। যে কারণে বিএনপিকেও তারা ভাল নজরে দেখত না। গলার কাঁটা হয়ে থাকলেও জোটে থাকা-না থাকা নিয়ে বহু বছর নীরব ছিল বিএনপি। জোট আছে না-কি নেই, তা বোঝা যাচ্ছিল না। এ নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেও এড়িয়ে যেতেন বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা। গত বছর ডিসেম্বরে সমঝোতার মাধ্যমে জোট ভাঙলে দুই দলের অবস্থান পরিস্কার হয়। এরপর বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দিলে পৃথক দল হিসেবে সেই আন্দোলনের শরিক হয় জামায়াত। এরপর সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা গ্রেপ্তারসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হলেও ন্যূনতম খোঁজ নেওয়া বা প্রতিবাদ না করায় বিএনপির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকের তালিকা থেকেও নিজেদের গুটিয়ে নেয় জামায়াত। তবে বিএনপি তাতে ভাল-মন্দ কোনও আওয়াজ না দিয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিতে থাকে।
অন্যদিকে, জামায়াতের রাজনীতি আওয়ামী লীগ দ্বারা এমনভাবে কোনঠাসা হতে দেখা যায় যে কর্মসূচি পালন তো দূরের কথা, জামায়াত-শিবিরে যুক্ত আছে শুনলেও পথে-ঘাটে আক্রমণের শিকার হতে দেখা গেছে নেতা-কর্মীদের। গত ১০ বছরের এমন অবস্থা হঠাৎই পরিবর্তন হয় জুন মাসে। ১০ জুন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অনুমতি নিয়ে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তনে সমাবেশ করে। এত বছর পর যুদ্ধাপরাধের কারণে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারানো দলটিকে কেন সরকার অনুমতি দিল, তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-আলোচনা। তখন চাউর হয়, জাতীয় সংসদের শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব বোধ করছে আওয়ামী লীগ। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় প্রশাসনের সর্বস্তরে আওয়ামী লীগের মনোভাবী লোক থাকায় নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও জাতীয় পার্টির বিরোধী দলের ‘ভূমিকা’ সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতে দিচ্ছে না। যে কারণে নির্বাচনে যাওয়ার চুক্তিতে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার প্রথম নিদর্শন হিসেবে কর্মসূচির অনুমতি পেয়েছে দলটি। যদিও ওই কর্মসূচির পর ঢাকা ও বাইরের বিভিন্ন বিভাগে অনুমতি চেয়েও আর পায়নি।
বিএনপি যে সরকার পতনের আন্দোলন করছে, মার্কিন ভিসানীতি প্রয়োগসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর নির্বাচন ও মানবাধিকার নিয়ে তৎপরতায় সেই দাবি আদায়ের একটা সম্ভাবনা প্রতীয়মান হয়। আবার, আওয়ামী লীগ যেভাবে অনড় অবস্থানে রয়েছে, তাতে করে বর্তমান ব্যবস্থায়ই আগামী নির্বাচন সম্পন্ন হবে এবং তারাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার ভিন্ন কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এ অবস্থায় দুই কূলই ঠিক রাখতে জামায়াত ইসলামী একদিকে বিএনপির সঙ্গে দূরত্বে থেকেও আন্দোলন করছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে অন্তরালের যোগাযোগ আছে বলেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনেকটা বাধাহীন দলটি।