নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। হাজার নদীর দেশ রূপসী বাংলা। নদী আমাদের মাতা। নদী আমাদের অঙ্গ-অংশীজন। এদেশের অপরাপর নদ-নদীর চেয়েও নিবিড়ভাবে অর্থনীতিতে, অর্থের ভিতকে প্রতিদিন মজবুত কওে দেয় যে নদীটি, তার নাম কর্ণফুলী। দখলে, দূষণে , নির্যাতন ও পীড়নের নদী।
বহুমাত্রিক দূষক থেকে, দূষণ থেকে এমনকি শোষক কিংবা দখলদার থেকে মিলছে না এর মুক্তি। বিচারের বাণী নিভৃতে, নিরবে, নিষ্ফল আহাজারি করছে। সব বিশ্বাসের অপমৃত্যু ঘটে চলে এই নদীতে। যে কেউ নদী পাড়ে গেলে দেখতে পাবে, নদীটি আগের চেয়ে দূষিত, বিড়ম্বিত, সংকুচিত এবং সমস্যাসংকুল। চুলকানি প্রক্রিয়ায় এর চিকিৎসা চলছে। ড্রেজিং-ড্রেজিং খেলা চলে। ব্যক্তি বিশেষের অর্থ আয়ের মাধ্যম হিসেবে নদীটি ভাড়া খাটছে, দেহ দিয়ে, সম্পদ দিয়ে, সম্ভ্রম দিয়ে, অস্তিত্ব দিয়ে।
পরিবেশ জ্ঞানসমৃদ্ধ পরিকল্পিত ড্রেজিং হচ্ছে না। দেশের আমলাতন্ত্র, রাজনীতিকদের উদাসীনতা দুর্ভাগ্যজনক। নদীর স্বাস্থ্য এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের কোনরকম ধারনা, তাড়না না নিয়ে নদীটিকে নিয়ে কথামালার সস্তা রাজনীতি চলে। আমাদের জাতিসত্তা হাজার বছরের ঐতিহ্যে পরিপূর্ণ। আমাদের জাতিসত্তা ভূ-প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক বিভিন্ন মাত্রার বৈচিত্র্য ও পথপরিক্রমায় সম্পৃক্ত একটি জাতিসত্তা।
আমাদের হাজার ঐতিহ্যের অন্যতম সম্পদ-সম্ভার নদী মাতা, নদী ঐতিহ্য। এ দেশের নদীর সাথে নারীর সম্পর্ক, খাল-বিল- হাওড়ের সাথে এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের সম্পর্ক, জীবনের সাথে জীবিকার সম্পর্ক, রাজনীতি ও অর্থনীতির সাথে পদ্মা-যমুনা-কর্ণফুলীর সম্পর্ক, মুক্তিযুদ্ধের সাথে নদীর জল ও জীবনের সম্পর্ক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও নিবিড় অঙ্গ-অংশ।
গত শতকের মাঝামাঝি থেকে নদী ঐতিহ্যকে আমরা বিলীন করে চলেছি। বিলুপ্তির তালিকায় রেখেছি। নদীতে ভাটিয়ালি গানের সুর-লহরী, নদীর জলে বধূর অবগাহন, নদীর বাদাম তোলা নৌকায় বনিক প্রেমিকের নিরুদ্দেশ যাত্রা কিংবা নদীতে বিরহীর ব্যথিত বিসর্জন আমাদের অতীতকে সমৃদ্ধ ও ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। বর্তমানকে নির্লিপ্ত করে রেখেছে। ভবিষ্যতকে স্বপ্নহীন কওে রেখেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের কর্ণফুলী নদী একটি ঐতিহ্য। একটি ইতিহাস। একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ভাণ্ডার। কর্ণফুলীর ঐতিহ্য বহুমাত্রিক, দিগন্ত বিস্তৃত। একটিমাত্র নদীকে বাংলাদেশের অর্থকরী নদী বলা হয়। অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ বলা হয়। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়ে থাকে। মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা তারও অনেক আগের সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যম হয়ে সমৃদ্ধ অতীতের বিস্তৃত সোপান দক্ষিণ বাংলাদেশের এই নদীটি নানা মাত্রিকতায় সমৃদ্ধ।
কর্ণফুলীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেলকেন্দ্রিক আগামী দিনের যে অর্থনীতি, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন ধরার যে প্রক্রিয়ায় শুরু হয়েছে, তার গুরুত্ব যথাযথভাবে আমারা উপলব্ধি করছি। কর্ণফুলী নদীর স্বাস্থ্যের প্রতি মহলের বিশেষের উদাসীনতা, নির্লিপ্ততা, নিষ্ক্রিয়তা আমাদের হতাশ করে। বিশেষায়িত নদী কর্ণফুলীর অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ কথা বলে, স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন দেখায়। এ নদীর ঐতিহ্যের উপর দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখায়। এ নদীর শ্বাস-প্রশ্বাস-প্রতিবেশ ডেল্টা প্লানের স্বপ্নকে বিস্তৃত করে। কর্ণফুলী নদী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশকে জানান দেয়।
প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে অর্থনীতির দ্রুত বর্ধনশীল একটি দেশ বাংলাদেশ। বৈশ্বিক বিভিন্ন সূচকে দেশটি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে দেশটির এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। জনসংখ্যার ঘনত্বে শীর্ষ দেশগুলোর একটি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। দেশটির অর্থনৈতিক সামাজিক অগ্রগতি, উন্নয়ন, বৈশ্বিক মাত্রাকে দ্রুত স্পর্শ করে চলেছে। এটি এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। বাসন্তীর ছেড়া জাল পরার দেশ নয়। খাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক নোংরা রাজনীতির লক্ষ্যবস্তু নয়। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় দেশটির গতি সকলের প্রশংসা কুড়াচ্ছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ অর্জনের পথে দেশটি এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতায়, মাথাপিছু আয়ে, জনগণের ক্রয় ক্ষমতায়, বৈশ্বিক বহুমাত্রিক সংকট- সমস্যাকে পাশে রেখে দেশটির অগ্রগতি প্রশংসনীয়। আমলাতান্ত্রিক সংকট আছে, রাজনৈতিক উদাসীনতা আছে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিবিশেষের অদূরদর্শিতা ও অজ্ঞতা ও অভিনয় আছে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্বজনপ্রীতির দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড আছে। সব কিছুর পরেও দেশটির এগিয়ে যাওয়ার গতি সকলকেই আপ্লুত- আকৃষ্ট করে। এটি-ই লড়াকু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দৃঢ় প্রত্যয়।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এই প্রত্যয় এবং প্রেরণাকে ধারণ করে বাংলাদেশকে দ্রুত উন্নয়নের একটি দেশে পরিণত করে তার চালক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। এখন বাংলাদেশ অর্থই শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশ। সন্দেহাতীতভাবে আমাদের বৈশ্বিক মূল্য বেড়েছে। জাতিগত সম্মান বেড়েছে। মানুষ হিসেবে দুনিয়ায় বাঙালি জাতিসত্ত্বার কদর বেড়েছে। এসবের জন্য কৃতিত্ব যাকে দেয়ার, তাঁকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই, সালাম জানাই, অভিনন্দন জানাই।
প্রাকৃতিক মূলধন সবুজ, হাওড়, নদী-পাহাড়, খাল-বিলের দেশ বাংলাদেশ। ৫২ বছর আগে এদেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লড়েছিল। তারা শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। তারা সম্মিলিতভাবে জীবন দিয়েছিল। সম্পদ হারিয়েছিল। স্বজন হারিয়েছিল। সম্ভ্রম হারিয়েছিল। তাঁরা জয়ী হয়েছিল।
স্বাধীনতাই আমাদের পরম শক্তি, তৃপ্তি, অহংকার। অহংকারের এই অর্জনে যে মহান নেতার অবদান বাংলাদেশের মাটির সাথে, ধূলিকণার সাথে, বাতাসের প্রবাহের সাথে, মানুষের হৃদস্পন্দনের সাথে, পাখির কাকলির সাথে, সবুজের সমারোহের সাথে, মন্দিরের শঙ্খ ও মসজিদের আজানের মধুর ধ্বনির সাথে, পালতোলা নৌকার ভাটিয়ালি গানের সাথে, সংস্কৃতিক ও সংহতির সাথে, কাকডাকা ভোরের হিমেল বাতাসের সাথে, অবারিত দিগন্তজোড়া আকাশের সাথে, মৃদুমন্দ দখিনা বাতাসের সাথে, নদীর কল কল ধ্বনির সাথে মিশে আছে অনন্তকালের জন্য- যে মহান নেতা, জাতির পিতা, তাঁকে তাঁর উত্তরাধিকার শেখ হাসিনাকে নিবিড় ভাবে শ্রদ্ধা জানাই।
নিবিড়ভাবে এ দেশের অর্থনীতিতে, অর্থের ভিতকে প্রতিদিন মজবুত করে দেয় যে নদীটি, তার নাম কর্ণফুলী। দখলে দূষণে পীড়ণের নদী। এ নদীকে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা, অংশীজনদের আহাজারি সবকিছুই যেন মুখ থুবরে পড়ে থাকে নদীর বেলাভূমিতে। এভাবেই দিনের পর দিন নদীটির স্বাস্থ্যহানি ঘটছে, দখল-দূষণ ঘটছে, অবস্থা জীর্ণ থেকে জীর্ণ তর হয়েছে। আমলা আছে, মামলা আছে, নির্লিপ্ততার নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা আছে, আশ্বাস আছে, প্রশ্বাস আছে, সুখকর বাণী আছে, কর্মতৎপরতার কথা আছে, ড্রেজিংয়ের নামে সুরসুরি আছে, অনৈতিক বাণিজ্য আছে। সবকিছু ছাপিয়ে দিনে দিনে নদীটি জীর্ণ হচ্ছে, শীর্ণ হচ্ছে, বিপদগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট অনেকে প্রচলিত অপ্রচলিত কৌশলের ফাঁদে ফেলে নদীটিকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে। তদারককারী, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নির্লিপ্ততা ও চরম উদাসীনতায় একদিন মহাবিপর্যয় ঘটবে। সব স্বপ্নের সমাধি রচিত হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ আমাদের পরিবেশ বোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার মতো পরিবেশ সচেতন একজন বিশ্ব পরিবেশ নেত্রীর নির্দেশনা, সাহচর্য এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছি আমরা। আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয়ের আলোয় পথে চলি, চেতনার শক্তিতে কথা বলি, জাতিসত্তার মহা বিসর্জনের অমিত শক্তির বলে বলিয়ান হয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখি।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত জাতীয় কোনো নদী নেই। অথচ আমাদের জাতীয় পশু, পাখি, ফল, ফুল, কবি, সংগীত প্রভৃতি আছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের শুধু জাতীয় নদী এখনো স্থির করা হয়নি। এটিকে নির্লিপ্ত অথবা উদাসীনতা বলা যায়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত, লাখো শহীদের রক্তের মিশেল দেয়া দেশ, মাটি, মানুষ, উত্তরাধিকার যেখানে সজীব, সেদেশে গুরুত্বপূর্ণ কোন নদীকে জাতীয় সম্মান না দেয়া, ইতিহাসের ঐতিহ্যকে পাশ কাটানোর সমতুল। এ বিবেচনায় অস্তিত্বের নদী কর্ণফুলীকে জাতীয় নদী ঘোষণা করার বহুবিবেচ্য যুক্তি ও দায় আছে। যেমন- ১. কর্ণফুলী বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী নদী। এ নদী জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখে। ২. কর্ণফুলী নদীর উপরে যে বন্দর প্রতিষ্ঠা, একে সমুদ্র বন্দর বলা হলেও, আসলে এটি কর্ণফুলী নদী বন্দর। বন্দর এবং কাস্টমস মিলে জাতীয় অর্থনীতিতে সিংহভাগ অবদান রাখে এই নদী। বহির্বিশ্বে এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশী প্রবেশদ্বার এই নদী। ৩. এই নদীকেন্দ্রিক আয় থেকে বছরে ২৫০০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জিত হয়। যা দেশের সমৃদ্ধিতে অবদান রাখে। ৪. দেশের বহির্বাণিজ্য ৯৩ ভাগ এবং আন্তঃবাণিজ্যের শতকরা ৯৮ ভাগ এই নদীর মাধ্যমে অর্জিত হয়। ৫. নদীর উপরে প্রতিষ্ঠিত এই বন্দরটি বিশ্বের মান ক্রমে ৬৪ তম। ৬. বাংলাদেশ অংশে দীর্ঘ ১৮৭ কিলোমিটারের পথপরিক্রমায় এই নদীর সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে সতের নৃগোষ্ঠীর চলমান ঐতিহ্য। তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিক, সামাজিক-পারিবারিক জীবন ও জীবনের বোধ। ৭. ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিযুগে এই নদীর মাধ্যম দিয়ে বিপ্লবীরা আনাগোনা করত। বিপ্লবকে ধারণ করে চষে বেড়াতো এর বিভিন্ন অঞ্চলে। অবশেষে এ নদীর জলে সমাধি হয়েছে বিপ্লবী সূর্যসেন তারকেশ্বরদের। ইংরেজদের, মগ, পর্তুগিজ জলদস্যদের শাসন এবং শোষণের পথে ছিল এই নদী। নির্যাতনের শিকার ছিল এই নদী। এই অঞ্চলের জাতিসত্তার স্মৃতি ধারক প্রবাহ এই নদী। ৮. সংস্কৃতিতে, সামাজিকতায়, অর্থনীতিতে, পরিবেশ প্রতিবেশে এই নদীর হাজার বছরের ঐতিহ্য আছে। ৯. কর্ণফুলী নদীর বিস্তৃত মোহনা অত্যন্ত উর্বর। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের জীববৈচিত্র্য, ফ্লোরা, ফাওনা, প্লাংটন, বেনথোসে সমৃদ্ধ অতি উর্বর একটি অঞ্চল এ নদীর মোহনা। ১০. সমুদ্রের মিঠাপানি এবং মিশ্রপানির মাছের সমৃদ্ধ সম্ভার এই নদী। ১১. বিভিন্ন শাখানদী থেকে সাগর উপকূল হয়ে হালদা নদীর কার্ব জাতীয় মা মাছের আনাগোনার একমাত্র মাধ্যম এই নদী। ১২. দেশের একমাত্র নদী যার সাথে এই অঞ্চলের ১৭টি শিল্পজোন এবং প্রায় সাড়ে তিনশত ছোট-বড় শিল্পের সংযুক্তি আছে। ১৩. উত্তর পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র সাম্পান সংস্কৃতির নদী কর্ণফুলী। ১৪. সাম্পানীয়া গান, নাটক, সিনেমা প্রভৃতি লোকজ সংস্কৃতিতে আলোড়িত- আন্দোলিত এই নদী কেন্দ্রিক অঞ্চলের মানুষ। ১৫. নদীটিকে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং প্রাণ প্রবাহ বলা হয়। ১৬. এদেশের মানুষ বিশ্বাস করে কর্ণফুলী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। ১৭. এটি দেশের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী, যার তলদেশ দিয়ে হাজার বছরের জাতীয়ঐতিহ্যের স্মারক বঙ্গবন্ধু টানেল তৈরি করা হয়েছে। ১৬. এই নদীর সাথে সম্পৃক্ত-সংশ্লিষ্ট পাঁচটি নদীকে পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে এই কর্ণফুলী। নদীর দুই পাড়ের সাতটি উপজেলার অধিবাসীর হাট-বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চাষবাসের জল সেচের সুযোগ করে দেয় এই নদী। ১৭. ঐতিহ্যবাহী হালদা নদীকে পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে এই কর্ণফুলী। চট্টগ্রাম মহানগরীর আশি লাখ নগরবাসীকে পান ও ব্যবহার্য পানি সরবরাহ করে এই নদী। ১৮. কর্ণফুলী নদীর উপরে বাঁধ দিয়ে ২৩০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয় প্রায় শতবর্ষ যাবত। ১৯. এই নদীর বাঁধের অপর অংশে কাপ্তাই লেক থেকে বছরে ১৩ হাজার মেট্রিক টন মাছ সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। ২০. ইতিহাসের বিখ্যাত অপারেশন জ্যাকপট সম্পন্ন হয়েছিল এ নদীর বুকে- উষ্ণ জলপ্রবাহে; যা বর্বর পাকিস্থানীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল। ২১. সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে এ নদীর গ্রোত, প্রবাহ, জল-সম্পৃক্ততা অনন্য, অসাধারণ ইতিহাসের অবর্জনীয় অঙ্গ-অনুষঙ্গ।
মহান স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে এই নদীকে চলাচলের জন্য বিপদ মুক্ত করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের নৌবাহিনীর দক্ষ নাবিক রেদকীন। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় চিরনিদ্রায় শায়িত তাঁর স্মৃতি আজও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যকে বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে লালন করে। আমাদের জাতিগত ঐতিহ্য, চেতনা, ঐশ্বর্য প্রত্যয়দীপ্ত পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রধান জ্বালানি। এসব ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করে আমরা শূন্য হাতে, ভিন্ন পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব না। নদীসহ আমাদের প্রাকৃতিক মূলধনগুলোকে যত্ন করে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যতকে সমৃদ্ধ করা আমাদের জাতিগত দায়িত্ব।
কর্ণফুলীর মত দেশের আর কোন নদী এত বেশি ইতিহাস মিশ্রিত, ইতিহাস সংশ্লিষ্ট, সম্পৃক্ত নয়। কর্ণফুলীর মত ইতিহাস আশ্রিত, ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্য বহনকারী নয় দেশের আর কোন নদী। তাই জননেত্রীর কাছে জনগণের দাবি, কর্ণফুলীকে জনতার নদী ‘জাতীয় নদী’ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হোক।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অধ্যাপক