নৌপথে ‘অন্ধকার’ যমদূত!

* সংশ্লিষ্ট দপ্তররের অবহেলায় দুর্ঘটনা ঘটছে - ড. হাদিউজ্জামান সাবেক পরিচালক দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র, বুয়েট * ক্ষমতাধর মালিকদের জন্য অন্ধকারে চলছে বাল্কহেড -মো. জয়নাল আবেদীন পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ * নৌপথ নিরাপদ রাখতে নৌ পুলিশ কাজ করছে -মো. শফিকুল ইসলাম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি, নৌ পুলিশ

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীপথে রাতে চলাচল করছে অন্ধকার যমদূত। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বাতি বন্ধ রেখে ধীরগতিতে ছুটে চলে বাল্কহেড নামের এই যমদূত। এসব বাল্কহেডের বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ঘটছে প্রাণহানী। দিনে দিনে নৌপথ পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। নৌ পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএ এর অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নৌযান সিগন্যাল বাতি ছাড়াই বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে বাল্কহেড। প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানী ঘটলেও টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। পণ্য বোঝাইয়ের পর বাল্কহেডের প্রায় পুরো কাঠামো পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ায় চলাচলের সময় শুধু ইঞ্জিনের দিককার সামান্য অংশ পানির ওপরে ভেসে থাকে। যা খালি চোখে দৃশ্যমান না হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। এসব বাল্কহেডের অধিকাংশ চালকই আবার অদক্ষ।
জানা গেছে, সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে বাল্কহেডের ধাক্কায় পিকনিকের যাত্রীবাহী ট্রলারডুবির ঘটনায় নারী, শিশুসহ ৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে নৌপথে ৫৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৭ জন। আর ৫০ জন আহত ও ৩৪ জন নিখোঁজ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত দেশে ৪৯টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৫৮ জন, আহত ৭ জন এবং নিখোঁজ ১২ জন। গত ১৬ জুলাই রাতে কেরানীগঞ্জের তেলঘাটে বাল্কহেডের ধাক্কায় যাত্রীবাহী একটি ওয়াটার বাস বুড়িগঙ্গায় ডুবে যায়। এতে মারা যান ৩ জন। ২০২২ সালে নৌপথে ১৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে বাল্কহেডের কারণে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত দেশে ৪৯টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ৫৮ জন, আহত ৭ জন এবং নিখোঁজ ১২ জন।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বালুবাহী নৌযানের নেই অনুমোদন, নেই ফিটনেস, নেই নিবন্ধনও। তবুও এরা চলছে নৌ-পথে। আবার যে সব চালক দিয়ে চালানো হচ্ছে তাদেরও নেই সনদ। অদক্ষ চালকের কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। বাল্কহেডের নিবন্ধন রয়েছে পোনে ৫ হাজার। আর নৌপথে চলছে ১১ হাজারেরও বেশি।
বুড়িগঙ্গা নদীতে খেয়া পারাপারকারী নৌকার মাঝি আয়নাল হোসেন বলেন, নৌ দুর্ঘটনার জন্য একমাত্র দায়ী বাল্কহেড। বাল্কহেড লোড হয়ে চলাচল করলে পানির সঙ্গে মিশে থাকায় এটাকে দেখা যায় না। আবার এটি দ্রুতগতিতে চলায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। বিশেষ করে রাতে বাল্কহেড চলাচল করলে দেখা যায় না।
জানতে চাইলে নৌ পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, নৌপথ নিরাপদ রাখতে নৌ পুলিশ সব সময় কাজ করছে। এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। অভিযান চালিয়ে প্রায় বাল্কহেডকে জড়িমানা করা হচ্ছে। এমন জব্দ করা হচ্ছে। তবুও থামানো যাচ্ছে না। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, বাল্কহেড অন্ধকারে চলাচল নিষেধ। প্রতিদিন অভিযান চলছে। কিছু মালিক ক্ষমতাধর, তাই তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না।
বাল্কহেড চালক সমিতির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, নদীর যেখানে সেখানে জাহাজ নোঙর করা যায় না। নির্ধারিত স্থানে নোঙর করতে হয়। তাই অনেক সময় গন্তব্য ফিরতে রাত হয়ে যায়। গায়ের জোরে নয়, নিয়ম মেনেই জাহাজ পরিচালনা করি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, নৌপথে শুধু বাল্কহেড না, অনেক অনিবন্ধিত নৌযানও রয়েছে। অনিবন্ধিত নৌযান ও বাল্কহেড মিলে ধীরে ধীরে অস্থিরতা তৈরি করছে। দুর্ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব অবহেলার জন্য দুর্ঘটনা ঘটছে।