দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা হোক বা না হোক- সংবিধানের বাধ্যবাধ্যকতা থাকায় জানুয়ারির মধ্যেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার পথে হাঁটছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ অনুযায়ী নভেম্বরের প্রথমার্ধে ঘোষিত হবে নির্বাচনের তফসিল। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের তিন মাসের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। এ হিসেবে বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৯ জানুয়ারি। আর আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা। যদিও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে বিএনপিসহ তাদের সমমনা দলগুলো। আর আওয়ামী লীগসহ ক্ষমতাসীন জোট বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। প্রধান দুই দল ও জোটের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে ইসি। তফসিল ঘোষণার পর প্রধান দুই দল ও জোটের মধ্যে ‘রাজনৈতিক’ কোনো সমঝোতা হলে ঘোষিত তফসিল আসতে পারে অল্পবিস্তর কিছু পরিবর্তন। ইসির নির্বাচন শাখার সঙ্গে কথা বলে মিলেছে এমন তথ্য।
সূত্র জানায়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও ইসি চাইলে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ৯০ দিনের মধ্যে দেয়া নির্বাচনের তারিখ বদলাতে পারে। যদি সেটির দরকার হয় তাহলে নির্বাচন কমিশনের সেই এখতিয়ার রয়েছে। সেক্ষেত্রে তফসিল সংশোধন করে দেয়া যায়। এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য তারিখগুলো পরিবর্তন করে দিতে পারে কমিশন। সূত্রটি জানায়, ২০০৮ সালে ড. এটিএম শামসুল হুদার নির্বাচন কমিশন তফসিলে ১৮ ডিসেম্বর ভোটের তারিখ দিয়েছিল। তখনও বিএনপি নির্বাচনে আসবে কিনা সেটা নিয়ে ছিল নানা ধরনের আলোচনা। এরপর বিএনপির সঙ্গে আলোচনার পর তাদের দাবির ভিত্তিতে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে করা ২৯ ডিসেম্বর।
এদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিবদমান দুই পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলছেন, তফসিল ঘোষণার পর নয়- তফসিল ঘোষণার আগেই প্রধান দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি। কারণ কোনো একটি বৃহৎ দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করার পথে গেলে দেশের সংকট আরও বাড়বে।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন সম্পন্ন করা, যাতে দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। একতরফা নির্বাচন কোনো নির্বাচনই নয়। নির্বাচন করতে হলে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকতে হয়।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে এখন রাজনৈতিক দলগুলোর বলা উচিত যে, আমাদের সাংবিধানিক ম্যান্ডেট হলো একটা নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা। একতরফা নির্বাচন কোনো নির্বাচনই নয়। তাই আপনারা যদি একটা সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারেন তা হলে আমাদের পক্ষে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার জন্য কমিশনেরও দায়িত্ব রয়েছে।
সুজন সম্পাদক বলেন, দুই রাজনৈতিক পক্ষই যদি তাদের এক দফা নিয়ে অনড় অবস্থানে থাকে তা হলে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ আরও কঠিন হবে। যার যার অবস্থানে তারা অনড় থাকলে দেশে সহিংসতা, উত্তাপ, উত্তেজনা বাড়বে-যা দেশবাসীর জন্য অমঙ্গল। এতে দেশবাসীর মধ্যে উৎকণ্ঠা আরও বাড়বে। তাই সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এবং দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দেশের শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দলকেও একটি ইতিবাচক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগেই রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি।
জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে ভোট করতে হবে। তাই রাজনৈতিক সমঝোতা হোক বা না হোক কমিশনকে কিন্তু নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। আর পুলিশ ও প্রশাসন সহায়তা করলে যেভাবেই হোক না কেন কমিশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে। কারণ আমাদের দেশে এরকম পাল্টাপাল্টি অবস্থান নতুন নয়। এরশাদ সরকারের আমল থেকেই এটা হয়ে আসছে। তখনও বলা হয়েছিল এরশাদ পদত্যাগ না হলে নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। কিন্তু এরশাদ ১৯৮৮ সালে নির্বাচন করেছিলেন। যদিও পরে আন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ঠিক একইভাবে ১৯৯৬ সালেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দল। কিন্তু দাবি না মেনে বিএনপি নির্বাচন করেছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে কয়েক মাস পর আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাই বিএনপি নির্বাচনে না এলেও সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও পুলিশ সহায়তা করলে ইসি নির্বাচন করতে পারবে।
সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিদেশি কূটনীতিকরা সবাই চাইছেন দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে কিন্তু নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। কারণ তাদেরও বড় একটা জনসমর্থন আছে। তবে কোনো দল নির্বাচনে না এলে এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের করণীয় কিছু নেই। কারণ সংবিধান ও আইন দিয়ে ইসির হাত-পা বাঁধা। তাই সংবিধান অনুযায়ী তাদের নির্বাচন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধান শর্ত হচ্ছে নির্বাচন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারতসহ অন্যান্য দেশে নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা থাকলেও আমাদের এখানে আস্থার একটা সংকট আছে। সে কারণে আলোচনার মাধ্যমে যদি সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন করা যায় তা হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলকেও কিছুটা ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে সমঝোতার দিকে এগিয়ে আসতে হবে। নির্বাচন কমিশনেরও উচিত সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।