বিমানবন্দরে স্বর্ণ চুরি দায় এড়াতে লুকোচুরি
◊ চুরির দায় এয়ারলাইন্সকে নিতে হবে -আজিজুল হক মিঞা, অফিসার ইনচার্জ, বিমানবন্দর থানা ◊ চুরির ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে -উইং কমান্ডার মোহাম্মদ মীরান, পরিচালক, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স ◊ প্রমাণ পেলেই ব্যবস্থা -তাহেরা খন্দকার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণ চুরির দায় নিতে চায় না কেউ। গত রোববার সিঙ্গাপুর থেকে আসা যাত্রীর লাকেজ থেকে স্বর্ণ খোঁয়া যাওয়ার অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা নেয়নি পুলিশ। কর্তৃপক্ষ বলছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, ঘোষণা দিয়ে যাত্রী স্বর্ণ এনে থাকলে দায় নিতে হবে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষকে। ইতোমধ্যে বিমানে লাগেজ নামানোর সিসি টিভি ফুটেজ পর্যলোচনা করছে বিমান বাংলাদেশ।
জানা গেছে, ১৫ অক্টোবর রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিমানে সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় আসেন স্বর্ণ খোঁয়া দুই যাত্রী। একদিন পরই তারা লিখিত অভিযোগ করলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কাছ থেকেও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ভুক্তভুগি যাত্রীরা অভিযোগ করেন, ব্যাগ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র বের করে নেয়া হয়েছে। চুরি হওয়া মালামাল না পেলে আত্মহত্যার হুমকিও দেন এক যাত্রী। এ বিষয়ে বিমানবন্দর থানায় কোনো মামলা না হলেও ব্যবস্থা নিতে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ ব্যাপারে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম বলেন, ১৫ অক্টোবর আনুমানিক সন্ধ্যা ছয়টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সিঙ্গাপুর হতে ফ্লাইট (বিজি-৫৮৫) অবতরণ করে। বেল্ট থেকে লাগেজ সংগ্রহের পরে চারজন যাত্রীর মূল্যবান সামগ্রী লাগেজ থেকে খোঁয়া গেলে তারা অভিযোগ করেন।
তিনি আরো বলেন, মূলত সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে নিয়মমাফিক চেকিং কাউন্টার, ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা তল্লাশিতে এই চারজন যাত্রী থেকে পাঁচটি লাগেজ বহন করছিলেন। পরে বিমানে ওঠার আগ মুহূর্তে লাগেজ পাঁচটির সাইজ বড় ও ওভারওয়েট হওয়ায় তা কেবিন লাগেজ থেকে হোল্ড লাগেজে স্থানান্তরের জন্য যাত্রীদের জানানো হয়। এরপর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পরে লাগেজ খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে মর্মে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সদস্যরা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে জানায়।
এছাড়া র্যাম্প সিকিউরিটি সদস্যরা বিমান অবতরণের পরে লাগেজ খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে বলে জানায়। পরে যাত্রীরা লিখিত অভিযোগ করেন এবং এই লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের কাছ থেকেও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বিমানবন্দরের কর্মকর্তা পরিচয় দেয়া এক ব্যক্তি কাজটি করেছেন। তবে ওই ব্যক্তির নাম জানাতে পারেননি ভুক্তভোগীরা। ভুক্তভুগি এক যাত্রী বলেন, সোনা আমার হাতেই ছিল। তাদের একজন আইসা বলতেছিল, তুই এগুলো নিয়া যাবার পারবি না। আমাগো দিয়া যা। এরপর ওই ব্যক্তি জোর করে আমার হাত থেকে সেসব নিয়ে যান।
আরেক যাত্রী বলেন, আমার কাছে ২৯ গ্রাম স্বর্ণ ছিল। আরও একটা চেইন মায়ের জন্য কিনেছিলাম। সঙ্গে দুটি মোবাইল ফোনও নিয়া গ্যাছে ভাই। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, তারা বিমান থেকে নামার প্রায় দুই ঘণ্টা পর একজনের লাগেজ আসে। বিষয়টি তখন সন্দেহ হয়। পরে তারা লাগেজ পেলেও সেটি খোলা পান। এরপর সবকিছু চেক করে দেখতে পান তাদের আনা স্বর্ণগুলো নেই।
এ বিষয়ে বিমানবন্দর থানা অফিসার ইনচার্জ আজিজুল হক মিঞা বলেন, এ ঘটনার দুই ভুক্তভোগীরা থানায় এসেছিলেন। তবে, তারা এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের করেননি। তারা আমাদের জানিয়েছেন, বিমান কর্তৃপক্ষকে তারা অভিযোগ জানিয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ দুই দিনের সময় চেয়েছে। আমরা যেকোনো সময় মামলা নেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি।
তিনি আরো বলেন, যাত্রী ঘোষণা দিয়ে স্বর্ণ এনেছে এর দায় বিমান কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। ওই যাত্রীকে স্বর্ণ দিতেই হবে। যাত্রী বিমানে ওঠার সময় স্বর্ণ জমা দেয়। তাহলে যাত্রীকে অব্যশই স্বর্ণ দিতে বাধ্য। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক তাহেরা খন্দকার বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এয়ারলাইন্সে এর কেউ জড়িত থাকলে ছাড় দেয়া হবে না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানবন্দরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছেন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘটনার বিষয় জানার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিশির খান বলেন, ‘আমি সিঙ্গাপুরে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করে চার বছর পর দেশে আসি। মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার নিমতলা সুলপুর গ্রামে আমার বাড়ি।’
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে ভুক্তভোগী যাত্রীদের কান্নাকাটির পর নড়েচড়ে বসে বিমান কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় সিভিল এভিয়েশন ও বিমানের সিকিউরিটি বিভাগ পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স পরিচালক উইং কমান্ডার মোহাম্মদ মীরান বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে বিমান বাংলাদেশ এসেছে, সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করে না। বাংলাদেশ বিমানের কর্মীরাও ওই দেশে কাজ করে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। চুরির সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক কোনো ছাড় দেয়া হবে না।