আইনের বেড়াজালে খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা!

বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার অনুমতি চেয়ে তার ভাই শামীম ইস্কান্দার ২৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। গুঞ্জন ওঠে, গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই পরিবার আবেদন করেছে, সরকারও বেশ নমনীয়। দীর্ঘ দিনের দাবি পূরণের আশা থেকে বিএনপির ভেতরে খালেদা জিয়ার গমনের জন্য দেশ নির্ধারণ নিয়েও আলোচনা হয়। তবে সপ্তাহ না পেরুতেই বিএনপির আশায় গুড়েবালি! গতকাল আইনমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, যেই ধারার প্রয়োগে বেগম জিয়া বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণের অনুমতি পেয়েছেন, একই ধারায় তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়ার সুযোগ নেই। এই ধারার প্রয়োগ বাতিল করে, অর্থাৎ বাসায় থাকার অনুমতি বাতিল করে তাকে আগে আদালতের আদেশ অনুযায়ী সাজাভোগের জন্য কারাগারে যেতে হবে। এরপর পুনরায় সেই ৪০১ ধারায় বিদেশে যাওয়ার জন্য আবেদন করলে বিবেচনা সাপেক্ষে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পেতে পারেন, নাও পেতে পারেন। আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আইন নয়, খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার অনুমতির আবেদন রাজনৈতিক দৃষ্টি থেকে নাকচ করা হয়েছে। দৃশ্যপট বলছে, আইনের বেড়াজালে বন্দী হয়ে আটকে গেছে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি।

গতকাল সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে তার পরিবারের পক্ষ থেকে করা আবেদন গ্রহণ করার সুযোগ নেই। আমরা এ মতামত দিয়ে আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি।

তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ে এটি বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ কিছুদিন আগে ছয় মাসের সাজা স্থগিত করার জন্য তার পরিবারের আবেদন সরকার গ্রহণ করেছে। একই বিষয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

আইনমন্ত্রী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যে আবেদন এসেছিল তাতে স্থায়ী জামিন ও চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এর আগে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী দুটি শর্তে তাকে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়। কাজেই আমরা নতুন করে আরেকটি আবেদন গ্রহণ করতে পারি না। আমাদের এ সুযোগ নেই।

আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে আইনের বিদ্যমান অবস্থান থেকে সরকারের আর কিছু করার নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১)-এর ধারার ক্ষমতাবলে শর্ত যুক্তভাবে তার সাজা স্থগিত রেখে শর্তযুক্ত মুক্তি দেয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশে যেতে পারবেন না। প্রথমে তাকে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়া হয়। পরে তা আরও আট বার বাড়ানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এখন আইনের যদি কোনও পরিবর্তন আনতে হয় তাহলে খালেদা জিয়াকে দেয়া শর্তযুক্ত মুক্তি আগে বাতিল করতে হবে। বাতিল করে আগের অবস্থায় যাওয়ার পর আবার অন্য বিবেচনা করা যাবে।

আইনমন্ত্রী জানান, ৪০১ ধারার কোনও আদেশ আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ নেই। ৪০১ ধারায় কোনও কিছু নিষ্পত্তি হলে তা আবার নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। যদি তিনি আবার জেলে যান এবং আদালত যদি আবার অনুমতি দেয় তখন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে, আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয়েছে, দেশে আইনের শাসন নেই। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভয়ংকর তামাশা করা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে- সরকার চাইলেই নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দিতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিকভাবে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও দেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে রাজবন্দিদের মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসা করানোর নজির আছে। সরকারের সিদ্ধান্ত জাতির প্রতি একটি নিকৃষ্টতম প্রতারণা।’

কায়সার কামাল বলেন, ‘আইনমন্ত্রী পাবলিক স্টেটমেন্ট দিয়ে বলেছিলেন- যদি খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়, তাহলে সুবিবেচনা করা হবে। তার এই পাবলিক স্টেটমেন্টের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার ভাই গত ২৫ সেপ্টেম্বর আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেই আবেদন আইনগতভাবে বিবেচনা না করে, রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফলাফল আমরা আজকের এ সিদ্ধান্তের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।’

অপরদিকে, গতকাল বিকেলে বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আইনমন্ত্রী রোববার বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার ৩/৪ দিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রী ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, বেগম জিয়াকে বিদেশে যেতে হলে প্রথমে জেলে গিয়ে আদালতে আবেদন করতে হবে। শনিবার জানা গেল, রোববার আইনমন্ত্রী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিবেন। আজ (রোববার) খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত আসলে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রে দেয়া বক্তব্যেরই বাস্তবায়ন।

রিজভী বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে আজ আইন মন্ত্রণালয়ের নেতিবাচক সিদ্ধান্ত মানবতা বিরোধী, বর্বর ইচ্ছা পূরণ ও অবিচারের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা জোর করে আঁকড়ে রাখতে শেখ হাসিনা পথের কাঁটা সরানোর দিগন্ত বিস্তৃত লালসা পূরণের নিষ্ঠুর প্রজেক্ট।

এর আগে, গত ২৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খালেদা জিয়ার ভাই শামীম ইস্কান্দার বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, খালেদা জিয়াকে আইন মেনেই পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি কয়েকটি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তিনি কারাগারে ছিলেন। কিন্তু তার স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী দণ্ডাদেশ স্থগিত করে বাসায় থেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। যাতে তিনি উন্নত চিকিৎসা পান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিদেশে নিতে তার ভাই আবেদন করেছিলেন। কিন্তু এখানে আইনি জটিলতা রয়েছে।