সংবিধান অনুসারে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ১ নভেম্বর থেকে ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে। ফলে আগামী ১ নভেম্বর থেকে নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হবে। তবে ভোটের তফসিল কবে ঘোষণা করতে হবে, এ বিষয়ে আইনে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই। এরইমধ্যে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন অভাসই দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সুতরাং নির্বাচনকে ঘিরে অক্টোবর মাসের ক্যালেন্ডার রাজনৈতিক কর্মসূচীতে ভরা। একদিকে বিএনপি’র শান্তি সমাবেশ তো আওয়ামী লীগের সুধী সমাবেশ। আবার আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্মসূচী তো বিএনপি’র সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক। এরমাঝেও রয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা, মার্কিনীদের চাপ, অর্থনৈতিক সংকট নিরসনসহ বহুবিধ ঘটনা। তাই অক্টোবর মাস বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসে অনেক কিছু ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা করছেন রাজনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্টরা।
বিভিন্ন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিও বলছেন, এই মাসে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘অক্টোবরেই সরকারের পতন ঘটবে।’ অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলছেন, ‘এই অক্টোবরেও আছি, আগামী অক্টোবরেও থাকবো।’ অক্টোবর নিয়ে পাল্টাপার্টি ঘোষণার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে কি হতে চলেছে এই অক্টোবরে।
আওয়ামী লীগের আয়োজনে আগামী ৩ অক্টোবর ঢাকার প্রবেশমুখ আমিনবাজারে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। ৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হবে। এ জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গণভবন পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে দলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেবেন। আগামী ৫ অক্টোবরও কাঁচপুরে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। ৭ অক্টোবর ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধন করা হবে। এ উপলক্ষে এয়ারপোর্টের সামনে এভিয়েশন মাঠে এক সুধী সমাবেশ হবে। সেখানে দুই লক্ষাধিক লোকের সমাগম করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ১০ অক্টোবর মাওয়া থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল লাইনের উদ্বোধন হবে এবং পদ্মা সেতুতে প্রথম রেল চলাচল উদ্বোধন হবে। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়কপথে মাওয়াতে যাবেন। মাওয়াতে সুধী সমাবেশ হবে। তাই হানিফ ফ্লাইওভারের প্রবেশমুখ থেকে মাওয়া পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে নেতাকর্মীরা দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাবে। এরপর ভাঙ্গায় অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তব্য দেবেন তিনি। ভাঙ্গা থেকে টুঙ্গিপাড়ায় রওয়ানা হয়ে নিজ বাসভবনে রাত্রিযাপন করবেন এবং পরের দিন ঢাকায় ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া তারিখ চূড়ান্ত না হলেও গণভবনে একটি নারী সমাবেশ করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সেখানে ১০-১৫ হাজার নারী প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। ১৬ অক্টোবর আইনজীবীদের বার কাউন্সিলের উদ্বোধন করা হবে সে উপলক্ষে সেখানে আইনজীবী মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২৩ অক্টোবর মেট্রোরেলের আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের উদ্বোধন হবে। এ উপলক্ষে মতিঝিলে সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ২৮ তারিখে চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু কর্ণফুলী টানেল উদ্বোধন হবে। সেখানেও বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ পুরো মাসব্যাপী আরও অনেক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করে রাজপথে থাকবে আওয়ামী লীগ।
বিএনপি এর মধ্যে আগামী ৪ অক্টোবর পর্যন্ত সভা-সমাবেশসহ ১২ দিনের কর্মসূচি পালন করছে। আওয়ামী লীগও ৪ অক্টোবর পর্যন্ত সাত দিনের কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে আছে। এর মধ্যে দুই দলের কর্মসূচির কোনো কোনোটি একই দিনে, কাছাকাছি স্থানে। ঘোষিত কর্মসূচির বাইরেও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সভা-সমাবেশ করছে।
বেগম খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ এবং জটিল অসুখে তিনি ক্রমশ মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন বলেই দাবি করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএনপির নেতারা বলছেন, এই মুহূর্তে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে না পাঠানো হলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই নিয়ে বক্তৃতায় আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণাও করেছিলেন। তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা: বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার আবেদন এখন আইন মন্ত্রণালয়ে। তবে প্রধানমন্ত্রী গতকাল ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এই ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। খালেদা জিয়াকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিতে গেলে আদালতের মাধ্যমে যেতে হবে বলেই তিনি দাবি করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার যদি কিছু হয় তাহলে রাজনীতি নতুন বাগ নেবে। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিএনপি বড় ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা করতে পারে। তবে সরকার যদি শেষ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেয় তাহলে সরকারের জন্য তা ইতিবাচক হতে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন।
অর্থনৈতিক সংকট: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। অক্টোবরে এই অর্থনৈতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে কোনো কোনো বিশ্লেষকের ধারণা। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভ ক্রমশ কমতে থাকা, ডলারের বাজারে হাহাকার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষকে দিশেহারা অবস্থায় নিয়ে গেছে। এই রকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে অর্থনৈতিক সংকট রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। এই অক্টোবর মাসে বোঝা যাবে অর্থনীতিতে সরকার কি ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন এবং সেই পদক্ষেপ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করে কিনা।
প্রধানমন্ত্রীর নাটকীয় ঘোষণা: অনেকেই মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি অক্টোবরে একটি নাটকীয় ঘোষণা দিবেন। আগামী ৪ অক্টোবর তার দেশে ফেরার কনিজস্ব প্রতিবেদকথা আছে। দেশে ফিরে তিনি নির্বাচন এবং বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো ঘোষণা দিতে পারেন এমন প্রত্যাশা করছেন অনেকে। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব সময় একটা ম্যাজিক থাকে। যেকোনো সংকটে তিনি একটা সমাধান নিয়ে হাজির হন। প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচন নিয়ে যে অচল অবস্থা তা দূর করার জন্য কোন ধরনের সমাধান দেবেন সেটার দিকে তাকিয়ে আছে অনেকে।
মার্কিন প্রভাব: একের পর এক বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা এবং শর্ত আরোপ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অক্টোবরে বোঝা যাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কি ভাবছে এবং কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি বাংলাদেশে নির্বাচন বন্ধ করতে চায়? এখানে একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করতে চায় নাকি নির্বাচনের ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয় হবে তা স্পষ্ট হবে এই অক্টোবরে।
ভারতের ভূমিকা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি কিভাবে দেখতে চায়? বিশেষ করে নির্বাচনের ব্যাপারে ভারতের অবস্থান কি তা পরিষ্কার হবে অক্টোবরেই।
সব মিলিয়ে অক্টোবর মাসের ক্যালেন্ডার ভরা সভা-সমাবেশ-আন্দোলন আর উন্নয়নের নানান ডামাডোলে ভরা। রাজনীতির শেষ বলে যেখানে কথা নেই, সেখানে এই মাস হয়তো হয়ে উঠতে পারে সংঘাতময়, আবার শান্তির পায়রা উড়িয়ে দিতে পারে অক্টোবরের প্রতিটি মূহুর্ত।