দেশে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে ১১৯ জন সাংবাদিক নানাভাবে নির্যাতন, হয়রানি, মামলা, হুমকি ও বাধার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
আজ সোমবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসক। দেশের ১০টি জাতীয় দৈনিক ও বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদ ও আসক সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সংস্থাটির পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়কালে নারীর প্রতি সহিংসতা, বিশেষত ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও হত্যাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ছিল উদ্বেগজনক। এছাড়াও বেআইনি আটকের অভিযোগ ও রহস্যজনক নিখোঁজ, নির্যাতন ও নিপীড়ন, সীমান্তে হত্যাসহ বহুল আলোচিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অপপ্রয়োগের ঘটনা বেড়েছে। সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো আসকের বিবৃতিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে (জানুয়ারি-জুন ২০২৩) এমনটি জানানো হয়।
মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয় মাসে ১১৯ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি, হুমকি, মামলা ও পেশাগত কাজ করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। ঢাকায় ২৯ জন এবং চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলার প্রতিটিতে ৮ জন করে সাংবাদিক রয়েছেন। বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও ৭১ টিভির জামালপুর জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম গত ১৪ জুন রাতে তার পেশাগত দায়িত্ব শেষে বাড়ি ফেরার পথে একদল সন্ত্রাসী হামলা চালায় এবং ব্যাপক মারধর করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৫ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা হামলা মামলার শিকার হচ্ছেন বলেও প্রতিবেদনে জানায় আসক। বিশেষত, প্রথম আলোর সাভার প্রতিনিধি শামসুজ্জামানকে সিআইডি পরিচয়ে ভোর রাতে তুলে নিয়ে যাওয়া এবং দিনভর তাকে আটকের ঘটনা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায়োগিক আচরণ যে অসঙ্গত ও বেআইনি তা প্রতীয়মান হয়েছে। এ ধরনের অমানবিক আচরণের অভিযোগ সাতক্ষীরা জেলায় কর্মরত সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁকে আটকের সময়ও পুলিশের বিরুদ্ধে উঠেছিল। রঘুনাথ খাঁকে আটকের পর পুলিশ দিনভর অস্বীকার করে প্রায় নয় ঘন্টা পরে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। এ সময়কালে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে আইনমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা গ্রহণের পূর্বে বিশেষ সতর্কতা বজায় রাখার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তার প্রতিফলন এ ঘটনাসমূহের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। বরং উচ্চপদস্থ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রথম আলোর প্রতিবেদক এবং সম্পাদক সম্পর্কে নানা মন্তব্য এ ধরনের মামলা দায়ের করতে অতি উৎসাহীদের অনুপ্রাণিত করছে বলে মনে হচ্ছে।
নারীর প্রতি সহিংসতা
গত ৬ মাসে যৌন হয়রানি কেন্দ্রিক সহিংসতা হয়েছে ১৫৪ জন নারী-পুরুষের ওপর, এর মধ্যে ৭৯ জন নারী ও ৭৫ জন পুরুষ। যৌন হয়রানির কারণে ১০ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। এ ছাড়া প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
আসক জানায়, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২০ জন নারীকে। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৩ জন নারী। এ ছাড়া, ৬৬ জন নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে।
আসকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পারিবারিক নির্যাতন করা হয়েছে ২৫৩ জন নারীর ওপর। যার মধ্যে হত্যা করা হয় ১৫৬ নারীকে। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৫৯ জন নারী।
যৌতুকের কারণে নির্যাতন করা হয়েছে ৭৪ জন নারীর ওপর। যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে ৩৪ জনকে এবং যৌতুকের কারণে নির্যাতনের পর আত্মহত্যা করেছেন ৩ জন নারী। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে ৩৭ জনকে।
এ সময়কালে মোট ১৩ জন গৃহকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৭ জন মারা গেছেন।
দেশের প্রায় সবকটি জেলায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানায় আসক। সর্বাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ঢাকায় ২৭। এরপরই রয়েছে নারায়ণগঞ্জে ২২, চট্টগ্রামে ১৬ এবং বগুড়ায় ১৫।
শিশু নির্যাতন ও হত্যা
দেশের বিভিন্ন স্থানে গত ৬ মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৮০৪ শিশু। একই সময়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১০৯ শিশু। ১ ছেলে শিশুকে বলাৎকারের পর হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যা করেছে ৪৫ শিশু।
সীমান্তে হত্যা
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ৬ মাসে অন্তত ১১ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা
একই সময়ে ৫টি ঘটনায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ৩টি বাড়িঘরসহ ১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় ১ জন নিহত ও অন্তত ৬২ জন আহত হয়েছেন। এ হামলার ঘটনায় ১০৩টি বাড়ি ও ৩৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
গণ পিটুনি
গত ৬ মাসে গণ পিটুনিতে নিহত হন মোট ২৪ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯ জন, খুলনা বিভাগে ১ জন, বরিশাল বিভাগে ১ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১ জন নিহত হয়েছেন।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পায় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়তে থাকে।
এ অবস্থায় নাগরিকের সব ধরনের মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায় বিচার দ্রততার সঙ্গে নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় সংগঠনটি।
এমএইচএফ