বোর্ডিং পাস জটিলতায় নিঃস্ব আমিরাত প্রবাসী
* ভিসার মেয়াদ থাকলেও ইমিগ্রেশনে দেখাচ্ছে ‘ক্যানসেল’, ক‚টনৈতিক নীরবতায় বিমানবন্দরে কান্না
পকেটে জমানো ছোট একটি কাঁচের বয়ামে দেশের মাটি, হাতভরা স্বজনদের ভালোবাসার স্পর্শ, আর বুকের গভীরে পরম আদরের সন্তানকে দেশে ফেলে আসার চিনচিনে ব্যথা। চট্টগ্রাম শাহ আমানত ও ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তখন গমগম করছে প্রবাসীদের বিদায়ের কোলাহল। মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র রোদে শরীর পুড়িয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই মানুষগুলোর চোখে তখন আবার প্রবাসে ফিরে একলা লড়াই শুরুর রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু ইমিগ্রেশন কাউন্টারে বোর্ডিং পাসটি হাতে নিতেই নিমিষে নিভে যাচ্ছে জীবনের সব আলো। পাসপোর্টে বছরের পর বছর ভিসার বৈধ মেয়াদ স্পষ্ট ছাপানো, বুকপকেটে সচল আকামা, অথচ ইমিগ্রেশনের কম্পিউটারের হিমশীতল মনিটরে ভেসে উঠছে একটিমাত্র নির্মম শব্দ-‘ক্যানসেলড’।
কোনো পূর্বসতর্ক বার্তা নেই, কারণ দর্শানোর নোটিশ নেই, এমনকি বিদেশে অবস্থানের আইনসম্মত ছয় মাসের সীমা অতিক্রম করার আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে তাঁদের আকামা। ট্রলি ব্যাগ আঁকড়ে ধরে বিমানবন্দরেই হুহু করে কেঁদে উঠছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা ; ইমিগ্রেশনের অটো কেনসেলশনে আটকে যাচ্ছে শত শত প্রবাসীর রুটিরুজি।
গত ২২ জুলাই থেকে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের একাধিক প্রবাসীর ভিসা একইভাবে ‘অটো-ক্যানসেল’ হওয়ায় সংকটটি এক করুণ মানবিক বিপর্যয় ও গভীর ক‚টনৈতিক উদ্বেগে রূপ নিয়েছে। কোনো প্রকার অপরাধ বা নিয়ম লঙ্ঘন না করা সত্তে¡ও হঠাৎ ভিসা বাতিলের কারণে শাহ আমানত ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ব্যাকপ্যাক হাতে নিঃস্ব হয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছে প্রবাসীদের। সংশ্লিষ্ট প্রায় সব দপ্তরে যোগাযোগ করেও অটো-ক্যানসেলের সুনির্দিষ্ট মোট সংখ্যা জানা যায়নি; তবে প্রাথমিক তথ্যে ৪১ জনের নিশ্চিত তালিকা পাওয়া গেলেও ভুক্তভোগীদের দাবি, এই সংখ্যা ইতোমধ্যে দুই শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে।
ফেনী জেলার সাহেববাজার, বারাহীপুর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অধিবাসী আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং একই জেলার বাসিন্দা নজরুল সুমন আড়াই মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে দেশে ছুটিতে আসেন। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তাঁদের কর্মস্থলে ফেরার কথা থাকলেও গত ২২ জুলাই কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ইমিগ্রেশন সিস্টেম থেকে একই সঙ্গে তাঁদের ভিসা বাতিল হয়ে যায়। একই দিনে তাঁদের সঙ্গে ছুটিতে আসা চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার কপিল উদ্দিন, মো. মামুন ও মো. মহিন নামের আরও তিন প্রবাসীর ভিসাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল দেখায়। ইউএই-এর স্থানীয় টাইপিং সেন্টারে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, ভিসা বাতিলের কোনো অফিশিয়াল কারণ ইমিগ্রেশন সিস্টেমে উল্লেখ নেই।
চোখের জল মুছতে মুছতে ভুক্তভোগী প্রবাসী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও ইমিগ্রেশন কাউন্টার থেকে যখন বলা হলো ভিসা বাতিল, তখন মুহূর্তেই মনে হলো মাথার ওপর পুরো আকাশটা ভেঙে পড়েছে। ধারদেনা করে কেনা প্লেনের টিকিটটাও নিমেষে মাটি হয়ে গেল।’
অনুরূপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা এলাকার মো. রবিন (পাসপোর্ট নম্বর সংরক্ষিত)। পাসপোর্টে ভিসার মেয়াদ ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত স্পষ্ট লেখা থাকা সত্তে¡ও ২২ জুলাই সিস্টেমে তা অকার্যকর দেখায়। বোয়ালখালীর কামাল উদ্দিন দুই মাস আগে দুবাই থেকে দেশে বেড়িয়ে এসে অটো-ক্যানসেলের কথা শুনে তড়িঘড়ি ফেরার চেষ্টা করলে বিমানবন্দরে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর ভিসাও বাতিল। কামাল উদ্দিনের মতো হাজার হাজার প্রবাসীর ব্যবসা-বাণিজ্য ও দোকানপাট এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। অন্যদিকে নাঈম ইসলাম নামের এক প্রবাসী জানান, শারজাহ বিমানবন্দরে অবতরণের পরও অনেক প্রবাসী একই ভিসা বাতিলের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ইমিগ্রেশনে আটকে আছেন।
আমিরাত ইমিগ্রেশনের প্রাতিষ্ঠানিক ট্র্যাকিং ডাটা বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ছয় মাসের নিয়ম ভঙ্গ না করলেও সিস্টেম থেকে গণহারে ফাইল বাতিল করা হচ্ছে। ট্র্যাকিং নম্বর ১০১৩৮০৮০-এর মেয়াদ ২০২৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও ২২ জুলাই ফাইলটি বাতিল দেখানো হয়। একইভাবে ১৫৬৬০১২২ নম্বর ফাইলটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত থাকা সত্তে¡ও গত ১৩ জুলাই সিস্টেমে ক্যানসেলড দেখায়। এছাড়া ৫৮৭৭১০৩৮ ও ৫৯৮০০৯৮৮ নম্বর ফাইল দুটির মেয়াদ আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত থাকলেও ২২ জুলাই দুটি ফাইলই ইমিগ্রেশন সার্ভার থেকে মুছে ফেলা হয়।
গভীর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই গণ-বাতিলের পেছনে মূলত তিনটি কারিগরি ও প্রশাসনিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, এটি আমিরাত এয়ারপোর্টের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেটেড সফটওয়্যারের গণনাগত ভুল। প্রবাসীরা দেশে অবস্থানকালে সময়ের সঠিক হিসাব এবং সিস্টেমে এন্ট্রি-এক্সিট মেলানোর ক্ষেত্রে এআই ভুলবশত স্বয়ংক্রিয় ক্যানসেলেশন জেনারেট করছে। বিশেষ করে ছুটি চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশে শর্ট ট্রানজিট নিয়ে থাকলে তা আইসিপি সিস্টেমে রি-এন্ট্রি হিসেবে নিবন্ধিত না হওয়ায় সফটওয়্যার তাকে দেশে ছয় মাসের অতিরিক্ত অবস্থান হিসেবে ধরে নিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, অনেক প্রবাসী পার্টনার বা ফ্রিজোন লাইসেন্সে যুক্ত আছেন, কিন্তু মূল স্পন্সর বা কোম্পানি বার্ষিক ‘ই-চ্যানেল’ নবায়ন না করায় সিস্টেম পুরো প্রতিষ্ঠানের অধীনস্থ সব ভিসা অকার্যকর করে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, কর্মীদের অজান্তে স্পন্সর পরিবর্তন কিংবা ই-সিস্টেমে তথ্যের অসামঞ্জস্য থাকলেও স্বয়ংক্রিয় বøক জেনারেট হচ্ছে। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা ‘এখন টিভি’র প্রতিবেদক কামরুল হাসান জনি বলেন, ভিসাগুলো মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকেই বাতিল করা হচ্ছে।
ভোগান্তিতে পড়া প্রবাসীদের এই চরম অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এভিয়েশন সিন্ডিকেট। প্রবাসী মোশারফ হোসেন পারভেজ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ভিসা বাতিলের আতঙ্কে যে যেভাবে পারছেন তড়িঘড়ি করে কর্মস্থলে ফেরার চেষ্টা করছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ট্রাভেল এজেন্সি ও এয়ারলাইন্সগুলো চট্টগ্রাম থেকে শারজাহ বা দুবাই রুটের টিকিটের দাম রাতারাতি দ্বিগুণ করে দিয়েছে। শাহ আমানত ও শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে দুবাই ও শারজাহগামী ফ্লাইটের স্বাভাবিক সময়ের ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার টিকিট এখন সিন্ডিকেটের দরকষাকষিতে ৮০ থেকে ৯৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সংকটটি চরম মানবিক রূপ নিলেও শুরু থেকেই দায়িত্বশীলদের একধরনের উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে। বিষয়টির সুনির্দিষ্ট সমাধানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য মেলেনি। টিকিটের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটে যোগাযোগ করা হলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা ‘চাটগাঁনিউজে’র সম্পাদক আলমগীর অপু সরকারের ভ‚মিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ক‚টনৈতিক বৈঠকগুলো নিতান্তই সান্ত¡নার ছবি আর আপ্তবাক্যমাত্র। স্পষ্ট বলা হচ্ছে না অটো ক্যানসেল হওয়া প্রবাসীদের অপরাধ কী। তুচ্ছ কারণ বা কারিগরি ভুল হলে বৈধ জরিমানা বা ভিসা ট্রান্সফারের সুযোগ দেওয়ার কোনো প্রস্তাব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তুলতে পারেনি। আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাস এক প্রকার নিষ্ক্রিয় প্রশাসন হিসেবে কাজ করছে।’
তবে নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে দ্রæত পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, ভিসা বাতিল ইস্যুতে ইউএই সরকারের হিউম্যান রিসোর্স মিনিস্ট্রির সাথে আলোচনার জন্য রাষ্ট্রদূত সময় চেয়েছেন এবং সোমবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যাওয়ার কথা রয়েছে। ক‚টনৈতিক চ্যানেলে এই জটিলতা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের স্বার্থ রক্ষা করা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জাতীয় দায়িত্ব।
ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞদের মতে, আকস্মিক ভিসা বাতিলের শিকার হওয়া প্রবাসীদের আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে নিজ কোম্পানির ই-চ্যানেল ও ট্রেড লাইসেন্স সচল আছে কি না পরীক্ষা করা উচিত। কোম্পানি সচল থাকলে ইউএই আইসিপি পোর্টালে ‘গ্রিভেন্স রিকোয়েস্ট’ পাঠিয়ে কিংবা ফ্রিজোন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আপিল করে অকার্যকর ভিসা পুনরায় সচল করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিমানে ওঠার আগে আইসিপি বা জিডিআরএফএ সিস্টেমে এমিরেটস আইডি দিয়ে ভিসার স্ট্যাটাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।