আগুন সন্ত্রাসের ভয়াবহ স্মৃতি ১০ বছর পর আবারো ফিরে এসেছে। নির্বাচন প্রতিহতের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি-জামায়াত জোটের হরতাল-অবরোধে ট্রেন,বাসসহ অসংখ্য যানবাহনে আগুন দেওয়া হচ্ছে। আর এতে প্রাণ হারাচ্ছেন নিরীহ সাধারণ মানুষ। নাশকতা ও হিংসার আগুনে গত দুই মাসে পুড়েছে প্রায় তিন শতাধিক যানবাহন। আর শুধু তিনটি ট্রেনের আগুনেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯ জন। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে রাজধানীর গোপীবাগে নাশকতার মাধ্যমে আগুন দেয়া হয় বেনাপোল এক্সপ্রেসে। এতে চারজনের প্রাণ গেছে। বিএনপি-জামায়াতের নাশকতার আগুনে ভুক্তভোগীদের বাঁচার আকুতি নাড়া দিচ্ছে মানুষের। এর আগে তেজগাঁওয়ে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের আগুনে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে পুড়ে মারা যান নাদিরা। বেনাপোল এক্সপ্রেসের আগুনে হৃদয়বিদারক আরেকটি দৃশ্য দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে সবাই। এর আগে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সারা দেশে ভয়াবহ নাশকতা চালায় বিএনপি-জামায়াত জোট। সেই সময় অসংখ্য বাস, ট্রেন ও স্থাপনায় আগুন দেয়া হয়, প্রাণ হারান শতাধিক মানুষ। বীভৎস সেই নাশকতা আবার ফিরে আসায় শঙ্কিত সাধারণ মানুষ।
বাঁচার আকুতি
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিএনপির ডাকা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল শুরুর আগে শুক্রবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর গোপীবাগ এলাকায় ট্রেনটিতে আগুন লাগে। বেনাপোল থেকে যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি ঢাকায় আসছিল। প্রায় সোয়া একঘণ্টা চেষ্টার পর রাত ১০টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু ততক্ষণে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান পাঁচজন। এদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, এখন পর্যন্ত ৫টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে তারা চারজনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে তখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। জানালা দিয়ে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন এক যাত্রী। হাত বাড়িয়েছিলেন সাহায্যের জন্য কিন্তু বের হতে পারেননি। শত শত মানুষের চোখের সামনে আগুনে পুড়ে মারা যান হতভাগ্য যাত্রী। রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের এই যাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস।
আগেও ট্রেনে নাশকতা
- গত ১৯ ডিসেম্বর রাজধানীতে ‘মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়। ট্রেনে দগ্ধ হয়ে মারা যান মা ও শিশুসহ চার জন।
- গত ১৩ই ডিসেম্বর গাজীপুরের ভাওয়ালে রেল লাইন কেটে ফেলায় এই মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের সাতটি বগিসহ উল্টে একজন নিহত হয়।
- গত ১৯ ডিসেম্বর রাতে দিনাজপুরের বিরামপুরে রেললাইনের ওপরে স্লিপার ফেলে রেখে নাশকতার চেষ্টা করেছেন হরতাল সমর্থকরা।
- গত ১৬ ডিসেম্বর মধ্যরাতে জয়পুরহাট রেলওয়ে স্টেশনে উত্তরা এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়।
- গত ১৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে নীলফামারীর ডোমারে রেললাইনের ফিশপ্লেট ক্লিপ খুলে নাশকতার চেষ্টা হয়েছিল।
- নতুন চালু হওয়া কক্সবাজার রেলপথের কর্ণফুলী সেতু থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথের অনেক যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে নাশকতার অপচেষ্টা হয়েছিল।
বাসে-ট্রাকে নাশকতা
- গত ২৮ অক্টোবর গভীর রাতে রাজধানীর ডেমরার দেইলা এলাকায় একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। এতে ওই বাসে ঘুমিয়ে থাকা চালকের সহকারী মারা যান।
- গত ২৭ নভেম্বর খাগড়াছড়ির গুইমারার হাফছড়ি রাতে সরকারি চালবাহী একটি ট্রাকে আগুন দিয়ে পুড়ে মারা যান হেলপার।
- এছাড়া বাসে আগুন দিয়ে দু’জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।
যানবাহন ও স্থাপনায় আগুন
- ২৮ অক্টোবর থেকে মোট ৩২১টি অগ্নিসংযোগ করা হয়।
- এতে ২০০টি যানবাহন ও ২১টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- এর মধ্যে ১৭৫টি বাস, ৪৫টি ট্রাক, ২৩টি কাভার্ড ভ্যান, ১১টি মোটরসাইকেল ও ৪৬টি অন্য গাড়ি।
২৮ অক্টোবর নাশকতা
গত ২৮ অক্টোবরে বিএনপির সমাবেশের দিন ভয়াবহ নাশকতা ও সহিংসতা হয়েছে। এসব ঘটনায়ঃ
- নিহত হয়েছেন ১ জন পুলিশ কনস্টেবল
- নিহত হয়েছেন ১ জন বিএনপি কর্মী।
- নিহত হয়েছেন ১ জন বাসের হেল্পার (ঘুমন্ত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হন)।
- পুলিশ আহত হয়েছেন ১১ জন।
- গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ৯২ টি।
- গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে ২০০ টি।
- মোট অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১১১ টি।
অতীতে বিএনপির হরতাল-অবরোধে নাশকতা
- দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালে টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি।
- রাজনৈতিক কর্মসূচিকেন্দ্রিক সহিংসতার দীর্ঘতম এক রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল বিএনপি।
- ২০১৩ সালেই ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২১৫ দিন হরতালে কেটেছে।
- বিএনপি-জামায়াতের দুই মাসের টানা অবরোধ ও হরতালে নিহত হয়েছেন ১১৫ জন, যার ৯০ জনই আওয়ামী লীগ কর্মী ও সাধারণ মানুষ। বাকিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।
নাশকতাকারীদের শান্তি চায় জাতিসংঘও
বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাস, ট্রেনে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বসংস্থাটির মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক।
সূত্র: একাত্তর টেলিভিশন



