পৃথিবী থেকে ঔপনিবেশিকতা দূর হয়েছে তাও অনেক আগের কথা। কিন্তু, রাশিয়া বিলুপ্ত ও বিস্মৃতপ্রায় ঔপনিবেশিকতাকেই মনে করিয়ে দিল বৃহস্পতিবার। এদিন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক টুইটার হ্যান্ডেলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভূমিকাকে নব্য-উপনিবেশবাদ হিসেবে মনে করে রাশিয়া। এ ধরনের পদক্ষেপকে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ’নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছে মস্কো।
টুইটে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেন, বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার কিছু রাজনীতিবিদের চিঠি প্রকাশের বিষয়টি আমরা দেখেছি। এটি হলো নব্য-উপনিবেশবাদ এবং একটি স্বাধীন দেশে নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের আরেকটি অপপ্রয়াস।
গত বছরের ডিসেম্বরেও একবার যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশের ‘পক্ষে’ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল রাশিয়া।
এই প্রসঙ্গে ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিকতার অবসান ঘটে। তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতন ঘটে এবং নতুন এক সাম্রাজ্যবাদের আবির্ভাব ঘটে। যাকে আখ্যা দেওয়া হয় নয়া উপনিবেশবাদ। প্রত্যক্ষ সাম্রাজ্যবাদ ছিল ভৌগোলিক সাম্রাজ্যবাদ। একটি দেশকে দখল করে তাকে উপনিবেশে পরিণত করত ভৌগোলিক সাম্রাজ্যবাদ। এমনি করে সসাগরা ধরণীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ রাজের প্রভুত্ব। সেসময় এমন এক কথা চালু হয়েছিল যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যেত না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ, আমেরিকা ও রাশিয়ার যুদ্ধজোট মিত্রশক্তি জয়লাভ করলেও ব্রিটিশ সিংহের কোমর ভেঙে গিয়েছিল। ফলে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে উপনিবেশসমূহ একে একে স্বাধীনতা লাভ করতে থাকে। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে আমেরিকা নতুন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে, মার্কিনিরা ভৌগোলিক সাম্রাজ্যবাদের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন না, সেটা তখন সম্ভবও ছিলনা। তারা প্রবর্তন করলেন অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ। এই সাম্রাজ্যবাদের মূলকথা হল ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রভূত্ব বিস্তার করা। আমেরিকার জাতীয় মুদ্রা ডলার আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রধান বিনিময় মাধ্যম হয়ে উঠে। এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলার অপ্রতিদ্বন্দ্বি মুদ্রা। চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশ জোটবদ্ধ হয়ে বিকল্প মুদ্রা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালালেও এখনো তার সাফল্য সুদূরপরাহত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্ব ব্যাংক এমনকি জাতিসংঘও আমেরিকার ইশারায় চলে।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমেরিকা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনীতি, কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির উপরও প্রভাব বিস্তার করে। প্রধান অস্ত্র উৎপাদক ও সরবরাহকারী দেশ হওয়ার সুবাদে আমেরিকা বিভিন্ন দেশের সামরিক খাতেও প্রভাব বিস্তার করে।
মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ালেও আমেরিকাই পৃথিবীর বহু দেশে গণতন্ত্র উচ্ছেদ করে সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করার মাধ্যমে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কলকাঠি নাড়ার ভুরিভুরি উদাহরণ মিলবে। যে সমস্ত গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনী প্রথা প্রচলিত আছে, সে সমস্ত দেশে নির্বাচন কিভাবে হবে সে ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উপদেশ, পরামর্শ দেওয়া ছাড়াও চাপ সৃষ্টি করতেও আমেরিকা কসুর করে না।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে, সে নির্বাচনের বহু আগে থেকে ইউরোপ, আমেরিকার রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিকরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তাদের এই অনাকাক্সিক্ষত হস্তক্ষেপের ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও তিতিবিরক্ত হয়ে রাশিয়ার ‘ঔপনিবেশিকতার নগ্ন হস্তক্ষেপ’ বলে উপনিবেশবাদের প্রসঙ্গই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল। রাশিয়ার টুইট বার্তায় সতর্কতা লক্ষণীয়। তারা বলেছে, নব্য উপনিবেশের কথা। কারণ, এখন তো আর সরাসরি কোন দেশ কারো উপনিবেশ হতে পারেনা।
বাংলাদেশ ইউরোপ, আমেরিকার উপনিবেশ বা করদরাজ্য নয়, যে তারা এদেশের নির্বাচন নিয়ে যখন তখন নসিহৎ দেবে। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই আমেরিকাকে বলেছেন, ‘ বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তাদের নিজেদের দেশে কতটুকু গণতন্ত্র আছে সেদিকেই তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করা দরকার’। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন ‘ নিজের চরকায় তেল দাও’।