নেতাদের হাতে অবৈধ অস্ত্র!
* অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আমরা সজাগ রয়েছি -মশিউর রহমান, উপ কমিশনার, ডিবি, ডিএমপি * অরাজগতা করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে -হারুন অর রশিদ, ডিবি প্রধান ডিএমপি * অবৈধ অস্ত্র বন্ধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে -কমান্ডার খন্দকার আল মঈন পরিচালক (মিডিয়া) র্যাব
সব ঠিকঠাক থাকলে জানুয়ারির প্রথম দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই রাজনৈতিক মাঠ গরম হচ্ছে। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতা জানান দিতে গড়ে তুলছেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। শহর থেকে গ্রামে সব জায়গায় ভোটারদের মধ্যে অবৈধ অস্ত্র আতঙ্ক। প্রতিদিনই সীমান্ত পেরিয়ে চোরাইপথে দেশি-বিদেশি অবৈধ অস্ত্রের চালান ঢুকছে বাংলাদেশে। আর এই সব অস্ত্র তুলে দিচ্ছে তুলে দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিক ক্যাডাদের হাতে। গত ৬ মাসে পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ৬০০টি দেশি-বিদেশি অস্ত্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার বন্ধ করতে হবে না হলে রাজনৈতিক মাঠে সহিংসতা বাড়বে। শান্তিপূর্ন নির্বাচন করতে কঠোর ভুমিকা রাখতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
জানা যায়, রাজধানীসহ সারাদেশে এখন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে হাতে অবৈধ অস্ত্র। নির্বাচনকে পুঁজি করে এমপি প্রত্যাশীরা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জেল থেকে মুক্ত করে রাজনৈতিক মাঠ দখলের চেষ্টায় তৎপর হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়তই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভেযানে মাঠে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সূত্র বলছে, গত ৬ মাসে শুধু র্যাব ৩০০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে ৭৫টি বিদেশি পিস্তল। আর পুলিশের অভিযানে ২০০টি অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছে অন্তত ১০০ জন। বাকি অস্ত্র অন্যান্য অভিযানে উদ্ধার হয়। গত তিন বছরে সারাদেশে প্রায় ৬ হাজার অস্ত্র বহনের দায়ে মামলা করেছে র্যাব পুলিশ।
সম্প্রতি রাজশাহী থেকে মিলন হোসেন (২৮) নামের এক রাজনৈতিক কর্মীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে র্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি র্যাবের কাছে স্বীকার করেন, নির্বাচনে সহিংসতার টার্গেট নিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতারা অবৈধ দেশি-বিদেশি অস্ত্র মজুদ করছে। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের বাজারে অস্ত্র নিয়ন্ত্রন করছে ২২টি সিন্ডিকেট। তারাই বিভিন্ন কৌশলে সারাদেশে পৌছে দিচ্ছেন। গত ৮ মে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে দুটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন এবং ৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। সম্প্রতি বিএনপির শীর্ষ নেতা ইশরাক হোসেনের পিএম আরিফুর ইসলামকে (৪৭) অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশ। আরিফ দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এর আগেও তিনি ৭/৮বার অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হলে অল্প দিয়ে আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের মিছিলে প্রকাশ্যে গুলি করার অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে মতিঝিলসহ সারাদেশে ১২টি মামলা রয়েছে। তবুও তিনি প্রকাশে ইসরাকের পিএস এর দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়াও রাজশাহী, সাতক্ষীরা, যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়াসহ সারাদেশে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় বিজিবির অভিযানেও নিয়মিত ধরা পড়ছে অবৈধ অস্ত্র। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী কিছু বেকার যুবকদের অস্ত্র বহনে বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারতীয় অস্ত্র ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বাংলাদেশি অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।
গোয়েন্দার একটি সূত্র বলছে, ভারতের সীমান্ত দিয়ে খুব সহজেই দেশে প্রবেশ করছে অবৈধ অস্ত্র। তারা কৌশলে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা মালবাহী ট্রাকে বহন করছে অস্ত্র। সেই অস্ত্র চলে যাচ্ছে রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে। যারা অস্ত্র মজুত করে আইনশৃঙ্খলা অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে তৎপর রয়েছে র্যাব পুরিশ।
এ ব্যাপারে র্যাব-৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, কৌশলে অবৈধ অস্ত্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ অস্ত্র বিক্রি করছে একটি চক্র। এক্ষেত্রে দেশে তৈরি ওয়ান শুটারগান বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, আর বিদেশি পিস্তল বিক্রি হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সব সময় তৎপর রয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কেউ যদি অরাজগতা সৃষ্টি করতে অস্ত্র ব্যবহার করে। তাদের ছাড় দেয়া হবে না। সে যে দলের থাকুক।
ডিএমপি গোয়েন্দা বিভাগের উপ কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, নির্বাচনকে পুঁজি করে কেউ যদি অস্ত্রের মহড়া দেয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো প্রকার পার পাওয়া সুযোগ নাই। নির্বাচনে আগেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আমরা সজাগ রয়েছি।
র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সব সময় কাজ করছে র্যাব। নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে আগামী নির্বাচনের সহিংসতা বাড়বে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ ও র্যাবকে তৎপর থাকতে হবে।