দেশে জ্বালানি তেল খালাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল।  আমদানির জ্বালানি তেল খালাস প্রক্রিয়ার নতুন যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।  দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপ লাইনের মাধ্যমে জাহাজ থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল খালাসের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।  সোমবার (৩ জুলাই) সকাল সোয়া ১০ টার দিকে কক্সবাজারের মহেশখালীতে এ কার্যক্রম শুরু হয়।

জানা গেছে, সৌদি আরব থেকে ৮২ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে আসে ‘এমটি হোরাই’ ট্যাংকার। সমুদ্রে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় এসপিএম লাইনে তেল খালাস প্রকল্পের কমিশনিং শুরু করা যায়নি। রোববার খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজটি মাতারবাড়ী এসপিএম প্রকল্পের হোস পাইপে নোঙর করে। সব চেক করে সোমবার সকাল সোয়া ১০টায় পাইপলাইনে তেল খালাস শুরু হয়। এরপরের দফায় পরিশোধিত তেলের জাহাজ এলে দ্বিতীয় পাইপলাইনটিও কমিশনিং করা হবে।

প্রকল্পের কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নে উপকূল থেকে ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) স্থাপন করা হয়েছে। এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি আলাদা পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আনলোডিং করা হবে। ১৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেই পাইপলাইন প্রথমে নিয়ে আসা হবে কালারমারছড়ায় সিএসটিএফ বা পাম্প স্টেশন অ্যান্ড ট্যাঙ্ক ফার্মে। সেখান থেকে বিভিন্ন পাম্পের মাধ্যমে ৭৪ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল চলে যাবে আনোয়ারা উপজেলার সমুদ্র উপকূলে। সেখান থেকে আবার ৩৬ কিলোমিটার পাইপলাইন পাড়ি দিয়ে তেল নিয়ে যাওয়া হবে পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে।

এ প্রসঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) লোকমান হোসেন বলেন, এসব পাইপলাইনে ২০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এসপিএম থেকে মহেশখালীতে এসে যেখানে পাম্প হবে, সেখানে দুই লাখ টন ধারণ ক্ষমতার একটি স্টোরেজ নির্মাণ হয়েছে। এর মধ্যে ক্রুড অয়েল থাকবে এক লাখ ২৫ হাজার টন। বাকি ৭৫ হাজার টন হবে ডিজেল বা পরিশোধিত তেল। এর মানে হচ্ছে এই পাইপলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে তেলের সংরক্ষণ ক্ষমতা বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

কর্ণফুলী নদীতে তেল খালাসের বিশেষায়িত জেটিতে বড় ট্যাংকার ভিড়তে না পারায় জ্বালানি তেল নিয়ে আসা বড় ট্যাংকারগুলো সনাতন পদ্ধতিতে প্রথমে সাগরে নোঙর করে রাখা হতো। এরপর ছোট ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল স্থানান্তর করে জেটিতে এনে পাইপের মাধ্যমে খালাস করা হতো। এতে এক লাখ টন তেলবাহী একটি ট্যাংকার থেকে তেল খালাসে ১০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগত। তেল খালাসে খরচ ও সময় বেশি লাগায় ২০১৫ সালে ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। নতুন প্রকল্পের আওতায় পাইপলাইনের মাধ্যমে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় প্রায় এক লাখ টন জ্বালানি তেল খালাস সম্ভব হবে।

জ্বালানি তেল খালাসের জন্য ভাসমান জেটিতে ট্যাংকার ভেড়ানো, টাগবোটসহ যাবতীয় সহায়তা দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সোহায়েল বলেন, প্রকল্পটির আওতায় ১১০ কিলোমিটার লম্বা দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন বসানো হয়েছে। একটি পাইপলাইন দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাস শুরু করা হলো আজ। অন্য পাইপলাইন দিয়ে শিগগিরই পরিশোধিত ডিজেল খালাস শুরু হবে।

প্রসঙ্গত, ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ইতোমধ্যেই প্রকল্পের মেয়াদ তিনবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বেড়ে ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। বর্তমানে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করতে পারে। এর দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে পরিশোধন ক্ষমতা ৩০ লাখ বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।

এমএইচএফ