* বাণিজ্যিক ব্লক ‘আরসেপ’ এ অচিরেই যোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ
* ২০১৯ সালে ‘আরসেপ’ থেকে বেরিয়ে আসে ভারত
* ভারত-বাংলাদেশ ‘ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টে’র আলোচনার গতি ‘ধীর’
তিস্তা নদীতে চীনের প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প বিবেচনা করছে বাংলাদেশ। তবে এ নিয়ে ভারতের আপত্তি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ‘ভূ-রাজনৈতিক’ বিবেচনায় এগোতে হবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
চীন বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নে তারা সহযোগিতা করে আসছে। তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশের উন্নয়নমূলক প্রকল্পে সহযোগিতা করার ব্যাপারেও চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং ইআরডি বিবেচনা করে দেখবে। তবে চীন বলছে, নির্বাচনের পরে তিস্তা প্রকল্পে কাজ শুরু হবে। কিন্তু চীন যেখানে তিস্তার কাজ করবে সেখান থেকে শিলিগুড়ি করিডোর খুব দূরে নয়। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারত চিকেন্স নেক নামেও অভিহিত করে। দেশটি মনে করে, তিস্তা উন্নয়ন কাজের নামে চীন চিকেন্স নেককে নিজেদের কব্জায় নিতে চায়। তাই ভারত চিকেন্স নেকের সামনে চীনের উপস্থিতি দেখতে চায় না।
অন্যদিকে, চীনের উদ্যোগে গঠিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্লক ‘আরসেপ’ (রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড ইকোনমিক পার্টনারশিপ)-এ অচিরেই যোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ। আরসেপকে বিশ্বের বৃহত্তম ‘এফটিএ’ বা অবাধ বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে গণ্য করা হয়-যাতে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘আসিয়ান’ভুক্ত দশটি দেশ, আর তাদের পাঁচটি এফটিএ সহযোগী-নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। ২০১১ সালে যখন থেকে আরসেপ-এর খসড়া নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল, ভারতও তার অন্যতম সদস্য ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালের নভেম্বরে নরেন্দ্র মোদি সরকার আরসেপ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ, তারা মনে করছিল এই জোটে তাদের উদ্বেগের কিছু কিছু বিষয় আমলে নেয়া হচ্ছে না। তবে পর্যবেক্ষকরা অনেকেই মনে করেন, আরসেপ গঠনে নেতৃত্বদানকারীর ভূমিকায় থাকা চীনের স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এটাই ছিল ওই জোট থেকে ভারতের বেরিয়ে আসার প্রধান কারণ। কিন্তু এখন প্রতিবেশী বাংলাদেশ ওই জোটে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে, এই বিষয়টি ভারতের কপালে কিছুটা দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত বছরেই দুই দেশের মধ্যে ‘সেপা’ (কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট) আলোচনা দ্রুত শেষ করার ব্যাপারে যে একমত হয়েছিলেন, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই খবরে ভারতে বেশ অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টে’র (অবাধ বাণিজ্য চুক্তি) আলোচনা নিয়েও দিল্লি কিছুটা ‘ধীরে চলো’ মনোভাব নিতে চাইছে। গত দুই-তিন দিনের মধ্যে ভারতের দুটি প্রধান অর্থনীতি-বিষয়ক দৈনিক ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ ও ‘দ্য হিন্দু বিজনেস লাইন’ উভয়েই এ খবরের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
বিজনেস লাইন ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে, ১৫ সদস্যের বাণিজ্য জোট আরসেপে যোগ দিলে বাংলাদেশে চীন থেকে পণ্য আমদানির পরিমাণ অনেক বাড়বে বলে ভারতের ধারণা। সে ক্ষেত্রে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেও এর একটা বড় প্রভাব পড়বে বলে দিল্লি মনে করছে। সেই ‘প্রভাবটা’ কত বড় আর কী ধরনের হতে পারে, তা ভালোভাবে যাচাই না করে ভারত-বাংলাদেশ অবাধ বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাকে তড়িঘড়ি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না বলেই বলছে বিজনেস লাইন।
অথচ আরো বছর তিনেকের মধ্যেই বাংলাদেশ এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নীত (গ্র্যাজুয়েটেড) হবে। এই পটভূমিতেই বাংলাদেশ কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে এফটিএ সই করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা চালাচ্ছে। এরকম অন্তত ১১টি দেশের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে, যদিও এই মুহূর্তে কোনও দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের পৃথক কোনও এফটিএ নেই। ফলে বাংলাদেশ আরসেপে যোগ দিলে চীনসহ বিশ্ববাজারের একটি বিরাট অংশ বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। আবার চীনা পণ্য বাংলাদেশের বাজার ছেয়ে ফেলবে এমন আশঙ্কা করছে দিল্লি। তিস্তা ও ভূ-রাজনীতি শঙ্কা নাকি সম্ভাবনা-তা জানা যাবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর।