ঢাকা-বেইজিং ২০ প্রকল্পে একমত হতে পারে

আগামী ৮ থেকে ১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর করবেন। এ সফরে ২০টির মতো প্রকল্পে একমত হতে পারে ঢাকা-বেইজিং। দুই দেশের ইস্যুকৃত যৌথ বিবৃতিতে যার উল্লেখ থাকবে। এরই মধ্যে বেইজিং যৌথ বিবৃতির প্রথম খসড়া তৈরি করে বাংলাদেশের বিবেচনার জন্য পাঠিয়েছে। ওই বিবৃতিতে কী কী বিষয় উল্লেখ থাকবে তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।

পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে (সাউদার্ন ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বা সিডি) চীনের সহায়তা চায় বাংলাদেশ। ওই অঞ্চলের কৌশলগত একটি স্থানে বৈদ্যুতিক গাড়ির একটি প্ল্যান্ট, একটি

হাই-টেক পার্ক এবং একটি লজিস্টিক হাব স্থাপন করতে চায় সরকার। দ্য বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভের আওতায় এই উন্নয়ন পরিকল্পনা চীনের কাছে উপস্থাপন করা হবে।

এছাড়া সরকার যোগাযোগ ও বিনিয়োগ অবকাঠামো নির্মাণ এবং জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে এসব প্রকল্পে চীনের কাছ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহযোগিতা চাইতে পারে বাংলাদেশ। এর মধ্যে দেশের রিজার্ভ সংকট মোকাবিলায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা এবং অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাকি ১৫ বিলিয়ন ডলার প্রকল্প সহায়তা হিসেবে চাওয়া হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ সংক্রান্ত বড় ঘোষণা আসতে পারে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রেল ও সড়ক যোগাযোগের মোট ৯টি প্রকল্পে লক্ষ কোটি টাকারও বেশি চীনা ঋণ প্রত্যাশা করছে ঢাকা। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মোট সাতটি প্রকল্পের জন্য ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে মহেশখালীতে এলএনজি সরবরাহের জন্য সমান্তরাল একটি পাইপলাইন। অন্যগুলো বিদ্যুৎ বিভাগের ছয়টি প্রকল্প, যার বেশির ভাগই সঞ্চালন লাইন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রেল ও সড়ক যোগাযোগের যে ৯টি প্রকল্পে বাংলাদেশ চীনা ঋণ পেতে চায়, সেগুলো হচ্ছে গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত নতুন মেট্রোরেল (যেটি মেট্রোরেল-২ নামে পরিচিত), ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, পিরোজপুরে কচা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ এবং মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর সেতু মেরামত, গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে জামালপুর পর্যন্ত মিশ্র গেজ রেলপথ নির্মাণ, রাজবাড়ীতে একটি রেলওয়ে ওয়ার্কশপ নির্মাণ, পাবনার ঢালারচর থেকে ফরিদপুরের পাচুরিয়া পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ এবং ভৈরববাজার থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত মিটারগেজ লাইন মিশ্র গেজে রূপান্তর প্রকল্প। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের আলোচ্যসূচিতে এই প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টি রাখার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৯টি প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন পাওয়ার আগ্রহের বিষয়টি বিস্তারিত জানানো হয়। রাজধানীর গাবতলী থেকে সদরঘাট হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত নতুন একটি মেট্রোরেল নির্মাণে ঋণ দিতে আগ্রহী চীনের এক্সিম ব্যাংক। এই প্রকল্পে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। এতে চীনের এক্সিম ব্যাংক প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা দেবে। এটি মেট্রোরেল-২ নামে হবে। ইআরডির সম্মেলনকক্ষে ইআরডির অতিরিক্ত সচিব মিরানা মাহরুখের নেতৃত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

মেট্রোরেল ছাড়াও ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের প্রকল্পেও চীনের আগ্রহ রয়েছে। জানা গেছে, এই প্রকল্পে ৪১ হাজার কোটি খরচ হবে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিক্যাব টক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, এ সফর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘বাস্তব সহযোগিতার নতুন রূপরেখা’ তৈরি করবে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে তাদের অবস্থান সমন্বয়ের সুযোগ করে দেবে। বেশ কয়েকটি সহযোগিতার নথি সই এবং যৌথভাবে বড় ধরনের সহযোগিতার অগ্রগতির ঘোষণা আসবে। রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফরের মাধ্যমে উভয় পক্ষ বাস্তবসম্মত সহযোগিতায় নতুন অগ্রগতি অর্জন করবে, যা উভয় দেশের জনগণের জন্য আরও সুবিধা বয়ে আনবে। সফরটি আগামী পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময়ে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও জোরদার করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও চীন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনার বদলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির লক্ষ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের (সেপা) দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্য, অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৮-১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় আনুষ্ঠানিক আলোচনার ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।