জামায়াত একাই লড়বে ৩০০ আসনে

যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশ এক দশক পর আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতনের জন্য এ দলের শীর্ষ ৬ জন নেতাকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলে তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়। এরপর দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হলে সারাদেশে দলীয় কার্যক্রম থেমে যায়। ২০১৮ এর জাতীয় নির্বাচনে যে কারণে অংশও নিতে পারেনি দলটি।

তবে গত ১০ জুন সরকারের অনুমতি নিয়ে এক দশক পর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ঘরোয়া সভার আয়োজন করে। সেদিন তাদের বিশাল শোডাউন রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জনের সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগ বলেছে জামায়াত বিএনপির বি টিম। বিএনপি বলেছে সরকারের সাথে আতাঁত করেছে জামায়াত। জামায়াত আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতাদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

তবে ঢাকার সমাবেশের পর থেকে জামায়াত সারাদেশে তাদের প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা শুরু করে। সর্বশেষ অনুষ্ঠিত চার সিটির নির্বাচনেও দলটির প্রায় ৪০ জন নেতা কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেছে। পরিচালনা করেছে সারাদেশে দাওয়াতি কার্যক্রম। আসন্ন দ্বাদশ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জোর প্রস্তুতি নেয়ার খবরও দিচ্ছে দলীয় দায়িত্বশীল নেতারা।

জানা গেছে, বিএনপির সাথে জোট বা আসন ভাগাভাগি কিংবা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য ৩০০ শত আসনেই প্রার্থী বাছাই করে রেখেছে দলটি। যেহেতু নিজেদের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নেই কোন দলের সাথে জোটবদ্ধ হলে তাদের প্রতীক কিংবা নতুন কোন প্রতীকে তারা নির্বাচন করতে চায়। এজন্য দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবেন।

দলটির নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি জামায়াতকে ছেড়ে দিচ্ছে এমন আলোচনা আছে। এই বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত নেতাদেরও অনানুষ্ঠানিক কিছু আলোচনা হয়েছে। জামায়াতকে আলাদা কর্মসূচি দেয়ার বিষয়েও বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছেন। তবে বিএনপি’র চলমান সংলাপে জামায়াতের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেছেন, সবার সঙ্গেই বৈঠক হবে। জামায়াতের সঙ্গে সংলাপ হবে। তাদের সঙ্গে কথা না বললে কেমন করে হবে। সবার সঙ্গেই তো কথা বলতে হবে। আর ২০ দলীয় জোট তো আমরা এখন পর্যন্ত বিলুপ্ত করিনি। এই জোটের কী হবে, সেটা এই আলোচনার মধ্যদিয়ে ফাইনালাইজড্ (চূড়ান্ত) করবো।

এ বিষয়ে জামায়াতের রুকন ও ঢাকা মহানগর উত্তরের শীর্ষ এক নেতা জানান, জামায়াত এবার পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো পরিকল্পনা করে এগোচ্ছে। আলাদাভাবে নির্বাচন করে বিএনপির সঙ্গে সরকার গঠন করতে চায়। আন্দোলনও আলাদাভাবে করার চিন্তা রয়েছে। বিএনপিও নিজেদের মতো করে জামায়াতকে আন্দোলন করতে বলেছে।

যদিও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বলছেন, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চান। এই দাবিতে বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে রাজপথে যুগপৎভাবে দীর্ঘদিন ধরেই মাঠে আছে দলটি। জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। তাই তারা দলীয় সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না।

তাদের মতে, রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে দলটি। আর নির্বাচনের সময়ও বেশি হাতে নেই। তাই বসে না থেকে ভোটের প্রস্তুতির কাজটি গুছিয়ে রাখতে চান তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্দোলনের পাশাপাশি সংগঠনকে গোছানো এবং দলকে নির্বাচনমুখী করাকেই এই মুহূর্তে প্রাধান্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর নীতিনির্ধারকরা। বৈরী এবং প্রতিক‚ল পরিস্থিতির মধ্যেই দলটির শীর্ষ নেতারা কেন্দ্র থেকে তৃণম‚ল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বেশি ব্যস্ত রয়েছেন। তারা বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যাচ্ছেন, প্রতিদিনই নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।

উল্লেখ্য , ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৭৬টি আসনে প্রার্থী দেয়। ওই নির্বাচনে দলটি ১০টি আসনে জয়ী হয়। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে জামায়াতে ইসলামী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তারা ১৮টি আসনে জয়ী হয়। এই নির্বাচনে দলটির ২২২ জন প্রার্থী ছিলেন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত তিনটি আসনে জয়ী হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনে তারা ১৭টি আসন পায়। ওই নির্বাচনে চারটি সংরক্ষিত নারী আসন পায় জামায়াতে ইসলামী। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত দুটি আসনে জয়ী হয়। ওই নির্বাচনে দলটি জোটগতভাবে ৩৯টি এবং চারটিতে এককভাবে নির্বাচন করে।

২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন (ইসি) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালে হাইকোর্টে করা রিট মামলার রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। সে কারণে নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে।

জামায়াতে ইসলামীর জোরেশোরে নির্বাচন প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে দলটির একজন সিনিয়র নেতা বুধবার বলেন, ‘আমরা বরাবরই নির্বাচনমুখী একটি গণমুখী রাজনৈতিক দল। আপাতত আমরা আমাদের দাবি আদায়ে রাজপথে আছি। পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছি।’ ওই নেতা নিজেও দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলা থেকে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।

নির্বাচন কমিশনে দলের নিবন্ধনের বিষয়টি আদালতে ঝুলে থাকায় আপাতত স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি রয়েছে। এজন্য প্রার্থী ঠিক করা ও নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে দলটি। ইতিমধ্যে নেতাদের বিভাগভিত্তিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনী জোট হলেও জামায়াত নিজেদের শক্তি নিয়েই আলাদা নির্বাচন করবে বলে নেতারা জানিয়েছেন।

দলীয় সূত্রমতে, জামায়াত নিজেদের মতো করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই জন্য দলের পক্ষ থেকে স্থায়ীভাবে একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন জামায়াতের নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইজ্জতুল্লাহ। এই কমিটি সারা দেশের রুকন, ওয়ার্ড সভাপতিদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছেন। সেখানে সবাই যাদের পক্ষে বেশি ভোট দিয়েছেন তাদেরকেই ওই আসনের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করছে জামায়াত। চলতি সপ্তাহে দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠকেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারানোয় জামায়াত একদশক ধরে দলীয় প্রতীকে ভোট করতে পারছে না। তবে আগের সব নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে ধারণা পাওয়া যায়, দলটির ভালো একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। এ বিষয়ে জামায়াত নেতা আবদুল হালিম বলেন, গত একদশকে আমাদের জনশক্তি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৮৭টি সাংগঠনিক জেলায় আমাদের কয়েক লাখ কর্মী রয়েছে। আমাদের প্রাণশক্তি ৫০ হাজারের বেশি রুকন রয়েছে সারা দেশে। এখনও জামায়াতের এক হাজারের বেশি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রয়েছে। আগামী নির্বাচনের লক্ষ্যে সবাই পরিকল্পনামাফিক কাজ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, সারা দেশের আসনগুলোতে এককভাবে প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এরজন্য তৃণম‚লের প্রতিটা নেতাকর্মীর কাছ থেকে অনুমতি নেয়া হচ্ছে। এছাড়া সারা দেশে বেশকিছু আসন রয়েছে যেখানে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতেরও হ্যাভিওয়েট প্রার্থী রয়েছে। ওই জায়গাগুলোতেও জামায়াত ছাড়তে চাইবে না। সেখানে স্থানীয় নেতারা জোটের পক্ষেও মত দিচ্ছেন না।

জানা গেছে-ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, কমিল্লা, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নীলফামারী, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুরসহ বিভিন্ন জেলার প্রায় শতাধিক আসনে ইতোমধ্যে প্রার্থী চ‚ড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। এর আগে বিভিন্ন আসনে জরিপ পরিচালনা করে।

জরিপের রিপোর্ট অনুযায়ী দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি দেশের বিভিন্ন আসনে প্রার্থী নির্বাচন করতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জেলায় আসন এবং প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মাঠে কাজ করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।