ছোটদের বড় হওয়ার নির্বাচন!

নাটকীয় কিছু না ঘটলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। মাঠের বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে কোন দল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে বিজয়ী হয়ে আসবে- তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) কি দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও প্রধান বিরোধী দল হতে পারবে- এমন প্রশ্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে।
নতুন সংসদে প্রধান বিরোধী দল হওয়ার দৌঁড়ে চমক দেখা যেতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। ইসির নিবন্ধন নিয়ে এবারই প্রথমবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী দিচ্ছে তৃণমূল বিএনপি নামের নতুন একটি দল। বিএনপির এক সময়কার হেভিওয়েট নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা গঠিত দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপিরই দুই আলোচিত নেতা তৈমূর আলম খন্দকার ও শমসের মোবিন চৌধুরী। দলটি এরই মধ্যে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার অংশ হিসেবে দলটি এরই মধ্যে মনোনয়ন ফরমও বিক্রি করেছে।
নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি ও অন্যান্য দলের হেভিওয়েট বেশ কিছু নেতা তৃণমূল বিএনপির দলীয় ফরম কিনেছে বলে তথ্য আসছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে আরেকটি আলোচিত দলের নাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম)। তারাও একই আদলে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই দুটি দলই ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। সূত্রের দাবি, কূটনৈতিক মহলের ধারাবাহিক চাপে দ্বাদশ নির্বাচনকে বৈধ করার জন্য নানা ধরনের তৎপরতা চলছে। সরকারি দল এবং তাদের জোট ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। সর্বশেষ বিএনপি জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির নির্বাচন করার ঘোষণায় চমক তৈরি হয়েছে। যদিও বড় চমকের নাম তৃণমূল বিএনপি।
জানা যায়, সংরক্ষিত চারটিসহ মোট ২৬টি আসন নিয়ে একাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাপা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিপরীতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন থাকায় স্বাভাবিক নিয়মেই জাপা প্রধান বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাপা কতটি আসন পাবে, কিংবা কতটি আসনে জয়ী হতে পারবে- তা নিয়ে খোদ জাপার ভেতরেই নানা কথা চাউর রয়েছে। জাপার বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে কান পাতলেও শোনা যাচ্ছে ভিন্ন কথা।
জাপার দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত তিনটি সংসদ নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন-সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করেছে জাপা। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন-সমঝোতায় ২২টি আসনে ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে জয়ী হন জাপার প্রার্থীরা। তবে এবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার আসন-সমঝোতা হবে কি না, হলেও জাপাকে কতটি আসনে ছাড় দেয়া হবে- তা নিয়ে বিভিন্ন সূত্র নানা আভাস দিচ্ছে। বেশির ভাগ সূত্রের আভাসমতে, বর্তমান সংসদের তুলনায় পরবর্তী সংসদে জাপার আসন সংখ্যা অর্ধেক কিংবা এর কিছু কমবেশি হতে পারে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে এবার জাপার আসন সমঝোতার বিষয়টি এখন পর্যন্ত যেমন ধোঁয়াশায় ঢাকা, তেমনি জাপার ভেতরের বিভক্তি সেই ধোঁয়াশা অবস্থাকে আরো গাঢ় করে তুলেছে। দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, নাকি দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাপা নতুন সংসদে যাবে- তা-ও এখনো নিশ্চিত নয়। আওয়ামী লীগের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আসন-সমঝোতা হলেও সেটি জি এম কাদের নাকি রওশনের সঙ্গে হবে, তা নিয়েও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। শোনা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে এবার আসন-সমঝোতা হলেও সেটি জি এম কাদের ও রওশনের সঙ্গে পৃথকভাবে হতে পারে। আবার রওশন বা জি এম কাদের কারো সঙ্গেই না হয়ে জাপার কোনো কোনো সম্ভাব্য এমপির সঙ্গে পৃথক পৃথকভাবেও হওয়ার সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে।
নতুন সংসদে জাপার সম্ভাব্য আসন সংখ্যা নিয়ে এরকম জল্পনাকল্পনার মধ্যেই বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দ্বাদশ সংসদে জাপার বদলে অন্য কোনো দলকে এককভাবে কিংবা নতুন কোনো জোটকে সম্মিলিত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে দেখা যেতে পারে। সূত্রের দাবি, জাপার পরিবর্তে এককভাবে কোনো রাজনৈতিক দল প্রধান বিরোধী দল হলে সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা বেশি সম্প্রতি আলোচনায় আসা ‘তৃণমূল বিএনপি’র। বিভিন্ন মহলেও পরবর্তী সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূল বিএনপির নাম উচ্চারিত হচ্ছে।
বিএনপির প্রয়াত নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল বিএনপি নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত। দলটির নির্বাচনি প্রতীক ‘সোনালী আঁশ’। দলটির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার বলেছেন, ‘আমরা জোটবদ্ধভাবে ৩০০ আসনেই নির্বাচন করব, অনেক দল আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। শক্তিশালী জোট গঠন করে নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা সরকার গঠন করব। আর যদি না-ও পারি, তবে আগামীতে আমরা হব দেশের প্রধান বিরোধী দল।’
তৃণমূল বিএনপি এরই মধ্যে জোটবদ্ধ হয়েছে ১৫টি ইসলামী, বাম ও উদারপন্থি রাজনৈতিক দল নিয়ে গঠিত ‘প্রগতিশীল ইসলামী জোট’-এর সঙ্গে। প্রগতিশীল ইসলামী জোটের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবে বলে ইসিকেও চিঠি দিয়ে জানিয়েছে তৃণমূল বিএনপি। জানা গেছে, সমমনা পুরোনো একাধিক জোট ও নতুন কয়েকটি দলকে নিয়ে বৃহত্তর জোট গঠনের লক্ষ্যে গত কয়েক দিন ধরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করছেন তৃণমূল বিএনপি ও প্রগতিশীল ইসলামী জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব। ইসিতে নতুন নিবন্ধন পেয়ে আলোচনায় আসা বিএনএম এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদ্য বহিষ্কৃত সদস্য আহসান হাবীবের নেতৃত্বে সম্প্রতি আত্মপ্রকাশ করা ‘স্বতন্ত্র গণতন্ত্র মঞ্চ’ও শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর এই জোটে ভিড়ে যেতে পারে। সূত্রের দাবি, বৃহত্তর এই জোট গঠিত হলে দ্বাদশ সংসদে তারা বসতে পারে প্রধান বিরোধী দলের আসনে।
তৃণমূল বিএনপির জোট শরিক প্রগতিশীল ইসলামী জোটের চেয়ারম্যান, ইসলামী গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য লায়ন এম এ আউয়াল বলেন, জোটবদ্ধভাবে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা। স্বাভাবিক কারণেই আমরা চাইব জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে যেন সরকার গঠন করতে পারি। আর সরকার গঠন করতে না পারলেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন নিয়ে দ্বাদশ সংসদের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে পারা আমাদের বিকল্প প্রত্যাশা। আশা করছি, সবকিছু ঠিক থাকলে দেশের জনগণ একটা চমক দেখতে পারবেন।
সার্বিক বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘জোট হবে বিভিন্নভাবে। কার সঙ্গে কার জোট হবে, কোথায় গিয়ে ঠেকবে বলা মুশকিল। জোট হতেও পারে নির্বাচনের আগে, সময় আছে। এমনও হতে পারে আপনিও ভাবছেন না, আমিও ভাবছি না। কিন্তু কার সঙ্গে কার জোট হয়, কেউ ভাবতে পারে না।’ প্রসঙ্গত, সংসদে বিরোধী দল কিংবা বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের বিষয়ে দেশের সংবিধানে কিছু বলা নেই। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার সংসদের স্পিকারের। সংসদের কর্যপ্রণালি বিধির ২(১)(ট)- তে বলা বলা হয়েছে, ‘বিরোধীদলীয় নেতা’ অর্থ স্পিকারের বিবেচনামতে যে সংসদ সদস্য সংসদে সরকারি দলের বিরোধিতাকারী সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্য লইয়া গঠিত ক্ষেত্রমতে দল বা অধিসঙ্গের নেতা।’
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার গঠন করতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকতে হবে, এটা সংবিধানে বলা আছে। যে দল রাষ্ট্রপতির কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে প্রতীয়মান হবে, সেই দলের নেতাকে উনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। আর সংবিধানে অনাস্থা ভোটের বিষয়ে বলা হয়েছে। এর বাইরে আর কিছু বলা নেই। তবে, প্রথা বা রেওয়াজ হচ্ছে- সরকারি দলের পর যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেই দলই বিরোধী দল হবে এবং সেই দলের নেতা বিরোধী দলের নেতা হবেন। সেখানে তাদের কতটি আসন থাকতে হবে, এরকম কোনো বিষয় নেই।