চট্টগ্রামে বারগুলোতে পারমিট ছাড়াই গণহারে বিক্রি হচ্ছে মদ

আইন অনুযায়ী, পারমিট (অনুমোদন সনদ) ছাড়া বারে মদ বিক্রি করা যাবে না। আর ২১ বছরের নিচে কেউ মদ পানের পারমিট পাবেন না। কিন্তু চট্টগ্রামের ক্লাব, হোটেল ও রেস্তোরাঁর বারগুলোতে পারমিট ছাড়া গণহারে বিক্রি হচ্ছে মদ। ২১ বছরের নিচে তরুণ-যুবকরাও বারে গিয়ে অনায়াসে মদ পান করছে। এতে নেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছে তরুণ-যুবকরা। অভিযোগ রয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশের এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বারগুলোতে এসব অনিয়ম চলছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী, বারে মুসলিম নাগরিকদের জন্য মদ নিষিদ্ধ। তবে কোনো মুসলমানকে একজন সহযোগী অধ্যাপক সমমানের চিকিৎসকের সনদ সাপেক্ষে মদ পানের পারমিট দেওয়া হয়। অমুসলিম নাগরিকদের মদ পানের পারমিট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিধান নেই। কিন্তু চট্টগ্রামের ক্লাব, হোটেল ও রেস্তোরাঁর বারগুলো এসব নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছে না। তারা কোনো পারমিট ছাড়াই অমুসলিম তো বটেই, মুসলিম ক্রেতাদের কাছেও মদ বিক্রি করছে।

মদপান, ক্রয় ও বিক্রির অনুমতি তথা লাইসেন্স প্রদান করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী, বারে প্রবেশ করতে হলে ক্রেতাদের আগে কর্তৃপক্ষের কাছে পারমিট প্রদর্শন করতে হবে। কিন্তু বারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্রেতাদের কাছে জানতেও চান না, মদ পানের পারমিট আছে কিনা। গত ৪ মে রাতে চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাটে ঐতিহ্যবাহী তারকা হোটেল শাহজাহানে অভিযান চালিয়ে পারমিটবিহীন ১৫ জন মাদকসেবীকে আটক করেছে পুলিশ। এরপর তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ। আটককৃত মাদকসেবীদের অধিকাংশই হলো তরুণ-যুবক।

সদরঘাট থানা সূত্রে জানা গেছে, হোটেল শাহজাহানের বারে পারমিট ছাড়া লোকজন মদ পান করে থাকেন। সন্ধ্যার পর অনেক তরুণ-যুবক হোটেলটির বারে প্রবশে করে। শেষ রাত পর্যন্ত চলে নাচ-গান বা ডিসকোর তালে তালে মদের গ্লাস বা বোতল হাতে মাদকসেবীদের উন্মাদনা। জানতে চাইলে সদরঘাট থানার ওসি গোলাম রব্বানী দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘আটককৃত ১৫ যুবক পারমিট ছাড়া হোটেল শাহজাহানের বারে গিয়ে মদ পান করছিলেন। এ সময় তারা সেখানে বিশৃঙ্খলা করেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে আমরা সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হোটেল শাহজানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শাহজাদা আলম দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘পুলিশের হাতে আটককৃতদের কাছে পারমিট ছাড়া মদ সরবরাহ করা ঠিক হয়নি। এটা আমাদের ভুল হয়েছে। পরবর্তীতে পারমিট ছাড়া আমরা কাউকে আর বারে ঢুকতে দিবো না।’

শুধু হোটেল শাহজাহান নয়, নগরীর আরও বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেলের বারে পারমিট ছাড়া মদ বিক্রি করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ক্লাব, হোটেল ও রেস্তোরাঁর বারগুলোতে বিদেশি মদ সরবরাহ করে থাকে পর্যটন করপোরেশন। বাংলা মদের দোকানে দেশি ও বিলাতী মদ সরবরাহ করে কেরু অ্যান্ড সন্স কোম্পানি।

জানা গেছে, বারে কী পরিমাণ মদ মজুদ রাখা যাবে সে বিষয়ে লাইসেন্সে কোনো শর্ত নেই। এই সুযোগে বারগুলো দুটি নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া অবৈধ ও চোরা পথে মদ কিনে থাকে। আর বারগুলো পারমিটের সাথে বিক্রয় হিসাব মেলানোর জন্য বৈধভাবে কেনা মদের চেয়ে অবৈধ ও চোরা পথে কেনা মদই বেশিরভাগ বিক্রি করে থাকে।

পারমিটের শর্ত অনুযায়ী, বারে একজন ক্রেতা মাসে সর্বোচ্চ ৫ লিটার মদ সেবন করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে পেশাদার মদ্যপায়ীরা এর চেয়ে দুই-তিনগুণ বেশি মদ পান করে থাকে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরীর অনুমোদিত বারগুলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কালে-ভদ্রে পরিদর্শন করে থাকেন। কিন্তু বারগুলোর অনিয়মের ব্যাপারে তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয় না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যেন ‘নিধিরাম সর্দার’।
জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মজিবুর রহমান পাটোয়ারী দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘যেসব বারে পারমিট ছাড়া মদ বিক্রি হয় সেগুলোকে আমরা হাতেনাতে ধরতে পারি না। আমরা পরিদর্শনে গেলে তাদের রেজিস্ট্রারে কোনো গরমিল পাই না।’ বারগুলোতে অবৈধ ও চোরা পথে কেনা মদ বিক্রি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বারে পরিদর্শনে গেলে তো তারা স্টোর থেকে সেগুলো সরিয়ে রাখে। কোনো সোর্স থেকে খবর পেলে বারগুলোতে অভিযান চালাবো।’

জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আ স ম মাহতাব উদ্দীন দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ক্লাব, হোটেল ও রেস্তোরাঁর বারগুলোতে পারমিট ছাড়া মদ বিক্রির খবর পেলে আমরা অভিযান চালাবো। ইতোমধ্যে সদরঘাটে একটি হোটেলের বারে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে আটক করেছে।’ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ের তথ্য মতে, চট্টগ্রাম নগরীতে পারমিটভুক্ত মদ্যপায়ীর সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজার। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র মতে, নগরীতে মদ্যপায়ীর সংখ্যা অন্তত ৫০ হাজার হবে। নগরীর বিভিন্ন তারকা হোটেলের বারে শতকরা ৯৮ ভাগ মদ্যপায়ী পারমিটবিহীন।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন চট্টগ্রাম মেট্রো দক্ষিণ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সোমেন মন্ডল দেশ বর্তমানকে বলেন, ‘মাদকসেবীরা সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবে আমাদের কাছ থেকে পারমিট নিতে চায় না। কারণ পারমিট নিলে আমাদের কাছে রেকর্ড থাকবে। তাই তারা পারমিট নিতে চান না।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বার ও দেশি মদের মহাল আছে ২০টি। এর মধ্যে বারের সংখ্যা হলো ১৬টি আর দেশি মদের মহাল হলো চারটি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারগুলো হলো-সদরঘাটে হোটেল শাহজাহান, হোটেল আগ্রাবাদ, হোটেল সেন্টমার্টিন, জিইসি এলাকায় হোটেল পেনিনসুলা, ওআর নিজাম রোডে হোটেল ওয়েলপার্ক রেসিডেন্স, স্টেশন রোডের পর্যটনবার, জুবিলী রোডের হোটেল টাওয়ার ইন, লিবার্টি টাওয়ারে নাইট শেডো ক্লাব লিমিটেড, পতেঙ্গা বোট ক্লাব, রেলওয়ে মেন্স বার, সদর ঘাটের হংকং বার, চিটাগাং ক্লাব, হোটেল রেডিসন ব্লু, ডরবলমুরিং ডিটি রোডের ইস্টার্ন হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট এবং জামালখানে সিনিয়র্স ক্লাব।

চারটি দেশী মদের মহালগুলোর মধ্যে কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় সাধন কুমার বিশ্বাসের মহাল, ফিরিঙ্গিবাজার এলাকায় অনুপ বিশ্বাসের মহাল, কদমতলী রেলওয়ে ম্যানস ক্লাবে তপন চক্রবর্তীর মহাল এবং মাইলের মাথায় রতন চক্রবর্ত্তীর মহাল।