কাজলা ডিভিশনে উড়ছে টাকা ডিপিডিসি’র প্রকৌশলীকে ঘুষ না দিলেই ভোগান্তি

কর্মকর্তার শ্যালকের আশির্বাদে নির্বিঘেœ দুর্নীতি # টাকা ছাড়া মেলে না সেবা, মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত -ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে -ড. ইকবাল মাহমুদ, সাবেক চেয়ারম্যান, দুদক বিষয়টি তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে -প্রকৌশলী আবদুল্লাহ নোমান, এমডি, ডিপিডিসি

বশির হোসেন খান
দুর্নীতি, অনিয়ম আর ক্ষমতার অপব্যবহারের কত রূপ, তা দেখাচ্ছেন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) লিমিটেডের কাজলা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম। বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ গড়ার পাশাপাশি অসাধু উপায়ে কামাচ্ছেন কাড়িকাড়ি টাকা। ক্ষমতার দাপটে কাউকেই যেন গ্রাহ্য করেন না। টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না এই দাপুটে কর্মকর্তা। এ ঘটনায় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর কাছে গণস্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ পত্র জমা পড়েছে। আরো অভিযোগ রয়েছে ডিপিডিসির প্রশাসন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার শ্যালক পরিচয় দিয়ে অপু চাকমা নামে একজন নিয়ন্ত্রণ করছেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের। তাকে টাকা দিলে মিলে যাচ্ছে পদোন্নতি কিংবা পছন্দের বদলি। দুর্নীতি করেও তার কারিশমায় পার পেয়ে যাচ্ছেন নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম অবৈধভাবে টাকা আয়ের জন্য নানা অজুহাতে প্রতিনিয়ত সাধারণ গ্রাহকদের হয়রানি করছেন। তার অত্যাচারে গ্রাহকরা অতিষ্ঠ। অবৈধভাবে টাকা আয় যেন তার নেশা ও পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব করতে তিনি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমাফিক যা খুশি তাই করছেন। বৈধ পন্থায় কেউ বিদ্যুতের সংযোগ নিতে প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র জমা দিলেও লোড নাই কিংবা ট্রান্সফর্মার সংস্কার হবে তার আগে সংযোগ দেয়া যাবে না এমন সব কল্পনাপ্রসূত মনগড়া অজুহাত দিয়ে গ্রাহককে হয়রানি করে থাকেন। আবার অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে কিংবা ঘুষ দিলে মুহূর্তেই সংযোগ দেয়া হয়, তাতে যদি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঘাটতিও থাকে। এভাবে ডিপিডিসির কাজলা ডিভিশনে অনিয়ম-দুর্নীতির এক অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছেন প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম।এরইমধ্যে প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে হওয়া অভিযোগপত্রটি প্রশাসন দপ্তরে ফাইলবন্দী রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ডিপিডিসির কাজলা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমি নির্দোষ, কোনো প্রকার অনিয়ম দুর্নীতির সঙ্গে আমি যুক্ত নই। তা ছাড়া আপনি তদন্ত করে দেখেন। আমি দুর্নীতিবাজ কিনা। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম ২০০৮ সালের ৩০ জুন ডিপিডিসির এনওসিএস কমলাপুর ডিভিশনে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদে যোগদান করেন। এরপর তিনি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় তাকে গ্রিড (সাউথ) এ দীর্ঘদিন সংযুক্ত করে রাখা হয়। পরবর্তীতে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে ২০১৪ সালের ২ মার্চ কোম্পানি সেক্রেটারিয়েটে বদলি করা হলেও পরের দিনই ফের একই পদে গ্রিড-১ এ বদলি করা হয়। এভাবে কয়েক দফা বিভিন্ন দপ্তরে বদলির পর ২০১৮ সালের ২১ জুন নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি হলে ট্যারিফ অ্যান্ড এনার্জি অডিট ডিভিশনে তাকে বদলি করা হয়। সেখানে ১৩ দিন চাকরির পর ২০১৮ সালের ৫ জুলাই ফের তাকে প্রজেক্ট-২ এর ৩৩/১১ কেভি সাব স্টেশন অ্যান্ড লাইন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনে বদলি করা হয় তাকে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট নির্বাহী পরিচালক অপারেশনস ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে তাকে বদলি করা হলে তিনি অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর এনওসিএস কাজলা ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করিয়ে নেন। আর এরপরই তার দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে, ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে রাশেদুল ইসলাম কমলাপুর বিভাগে কর্মরত অবস্থায় ৪০ লাখ টাকা চুরির দায়ে ডিপিডিসির তৎকালীন কোম্পানি সচিব মো. মনির চৌধুরীর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল। তখনও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করান রাশেদুল।
এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ড. ইকবাল মাহমুদ বলেন, দুর্নীতি বন্ধ না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই দুর্নীতিবাজ যে হউক তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের(টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়ম, দুর্নীতির সঙ্গে যে বা যারা জড়িত তাদের বের করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। দুর্নীতি থাকলে দেশে সুশাসন থাকবে না।
এ ব্যাপারে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী আবদুল্লাহ নোমান বলেন, আমি ঘটনা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।