- নিরাপত্তায় সক্রিয় ডগ স্কোয়াড, বোম্ব ডিসপোজাল টিম
- অপরাধ বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক টহল কার্যক্রম
- টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত
- ফাঁকা ঢাকার বাসাবাড়ি রক্ষায় বাড়তি টহল
- নিরাপত্তা সহায়তায় পুলিশের জরুরি হটলাইন
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘরমুখী মানুষের ঈদযাত্রায় ভোগান্তি নিরসনে ছিনতাই, ডাকাতি, টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে চেকপোস্ট, অতিরিক্ত টহল ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাও শুরু করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও পুলিশ।
একইসঙ্গে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাট এবং ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। এছাড়াও ঈদের ছুটিতে ফাঁকা রাজধানীর বাসাবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
এদিকে সাধারণত ঈদকে কেন্দ্র করে কোটিরও বেশি নগরবাসী রাজধানী ত্যাগ করেন। ফলে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয় রাজধানী থেকে বের হওয়ার মুখগুলোতে। আর নগরবাসীর এই গমনাগমনে সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধী চক্রগুলো। এই অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে বেশ খানিকটা বেগ পেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। একই সঙ্গে ছুটির ফাঁকা ঢাকায়ও রয়েছে নিরাপত্তা সংশয়। নগরবাসীর ফাঁকা বাসা-বাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিতে দিনরাত সজাগ থাকতে হয় তাদের। ফলে এবার ঈদকেন্দ্রিক নগরবাসীর চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ফাঁকা ঢাকায় নগরবাসীর রেখে যাওয়া সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো।
নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ঢাকা শহরসহ সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আগের ঈদগুলোতে কী ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করেই এইবারের ঈদনির্ভর কার্যক্রম ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এই বাড়তি চেকপোস্টের পাশাপাশি আমাদের থাকছে অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থা। এইভাবে সব পরিকল্পনা মাথায় রেখে কার্যক্রম সাজানো হচ্ছে যেন ঈদের সময় কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম না থাকে। ছিনতাই-রাহাজানির এই কাজগুলো যে কোনো সময় হয়। সেই সময়গুলো নির্ধারণ করে আমাদের টহল কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করা হবে।
‘টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে গাবতলী, সায়েদাবাদ, ট্রেন স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিনই র্যাবের কোনো না কোনো ব্যাটালিয়ন সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। এর পাশাপাশি ঈদে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের ডগ স্কোয়াড, বম ডিসপোজাল টিম সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত থাকবে। এছাড়াও র্যাব হেডকোয়ার্টারের সাইবার মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিকভাবে চলমান থাকবে।’
ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া নগরবাসীর বাসাবাড়ির নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের মুখপাত্র বলেন, ঈদের সময় ঘরবাড়িতে চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পায়। ওই সময়ে আমাদের ১৫টি ব্যাটালিয়ন ঢাকা শহরসহ সারাদেশে একযোগে অভিযান পরিচালনা করবো ইনশাআল্লাহ।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাব-২-এর উপ-অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খালিদুল হক হাওলাদার বলেন, ‘নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজধানীর চার-পাঁচটা ফোকাল পয়েন্টে আমরা নিয়মিত চেকপোস্ট করছি।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘ঈদযাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন বাস ও রেলস্টেশনে আমাদের অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে যাতে ঘরমুখী সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হয়। মানুষ রাজধানী ত্যাগ করার পর যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে সেজন্য মহানগরীতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছি।’
ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া নগরবাসীর বাসাবাড়ির নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকবে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি, মোবাইল টিম ও চেকপোস্টের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নগরবাসীর অনুপস্থিতিতে তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি।’
এদিকে এর আগে গত ২ মার্চ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সব জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মতবিনিময়ে নির্দেশনা দেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে কোনো ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দস্যুতা হতে দেওয়া হবে না। মহাসড়কে ডাকাতি রোধে হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশকেও দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রধান প্রধান মার্কেটে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে পোশাকশিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়ে প্রায়ই এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়, যা আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। আসন্ন ঈদে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে—এমন গার্মেন্টস বা শিল্প প্রতিষ্ঠান চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি শ্রমিক নেতা, মালিক এবং বিজিএমইএর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মৌলবাদীদের উত্থান রোধে আমাদের সজাগ ও সতর্ক নজরদারি বজায় থাকবে।’
গত ৫ মার্চ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে মতবিনিময় সভা করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। ওই সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঈদকে সামনে রেখে জাতীয় মহাসড়ক, গুরুত্বপূর্ণ করিডোর এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মেরামত ও সংস্কারের কাজ ঈদের অন্তত ১০ দিন আগেই শেষ করতে হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজধানীর সদরঘাট, মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও ফুলবাড়িয়া টার্মিনালে প্রয়োজনীয় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এসব টার্মিনালকে বিআরটিএ ও পুলিশের কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে সংযুক্ত করে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হবে।
উপজেলা, জেলা ও মেট্রোপলিটন সড়ক নিরাপত্তা কমিটিগুলোকে ঈদের আগে সভা করে সড়ক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী বহন প্রতিরোধে বিআরটিএ, পুলিশ, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
গত ১১ মার্চ ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন উপলক্ষে ডিএমপির নিরাপত্তা সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়েও নিরাপত্তা সচেতনতাবোধ তৈরি হতে হবে।
তিনি বলেন, ঈদ উদযাপনকে সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করতে প্রতিটি সরকারি সংস্থাকে আগের চেয়ে আরও বেশি মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল ও রেলওয়ে স্টেশনে পর্যাপ্ত সংখ্যক ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশ, ডিবি, সোয়াট, ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
মো. সরওয়ার আরও বলেন, ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করতে পারলে ঈদযাত্রার নানা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থার ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি আহ্বান জানান যেন ঈদের নামাজকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম আরও জোরদারভাবে পরিচালনা করা হয়।
এদিকে আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে উদযাপনের জন্য যেকোনো নিরাপত্তায় প্রয়োজনে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের কন্ট্রোল রুমে ০১৩২০০০১৩০০, ০১৩২০০০১২৯৯, হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ০১৩২০১৮২৫৯৮, রেলওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ০১৩২০১৭৭৫৯৮, নৌ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ০১৩২০১৬৯৫৯৮, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ০১৭৭৭৭২০০২৯ নম্বরে এবং জেলা পুলিশ সুপার ও থানার অফিসার ইনচার্জের (ওসি) সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধও জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।
এবার চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২০ বা ২১ মার্চ মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপন হবে। চলতি বছর রমজান ৩০ দিন ধরে ঈদের ছুটি নির্ধারণ করেছে সরকার। রমজানের ৩০ দিন পূর্ণ হলে ঈদ হবে ২১ মার্চ। আজ ১৭ মার্চ থেকে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হয়েছে। এই ছুটি থাকবে ২৩ মার্চ পর্যন্ত।