আজ ভালোবাসার দিন

আজ পহেলা ফাগুন, “ বসন্ত উৎসব”।  একই সাথে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস।  বারো মাসে তেরো পার্বণ, এই ধারায় উৎসবপ্রিয় বাঙালি বরাবরই আনুষ্ঠানিকতায় ভীষণ অগ্রগামী।  এই দু’টি বিশেষ দিন একসাথে হওয়ার কারণে উৎসবের মাত্রাও তাই ভিন্নতা পেয়েছে এবার।  নগরীতে সাজ সাজ রব পড়ে যাবে আজ।
হলুদ, কমলা, বাসন্তি, লাল রঙের কাপড়ে নিজেদের রাঙিয়ে তুলবে নানান বয়সি নাগরিকরা। হাতে, গলায়, চুলে -খোঁপায় রঙিন ফুলে সেজে ললনারা উৎসবে মেতে উঠবেন।  ঋতুরাজ বসন্তকে বরণে এই দৃশ্য অতি পরিচিত নগর জীবনে। একটা উপলক্ষ পেলেই হলো।  হাঁফিয়ে উঠা নাগরিকরা মূলত উৎসবের আড়ালে একটু স্বস্তির পরশ খুঁজে বেড়ায়।

২৬৯ সালের কথা, ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে ছিলেন একজন খৃষ্টান পাদ্রী।  একই সাথে তিনি একজন চিকিৎসকও ।  সেই সময় রোমানরা সাম্রাজ্য পরিচালনা করছিলেন। রোম সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস একদিন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে গ্রেফতার করলেন।  তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি খৃষ্টান ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে প্রজাদের বিভ্রান্ত করছেন। কারণ তখন রোম সাম্রাজ্যে এই ধর্ম নিষিদ্ধ ছিল।

এদিকে ধর্মযাজক ভ্যালেন্টাইন কারাগারে বসেও তার সেবা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।  তিনি এক কারারক্ষির দৃষ্টিহীন কন্যাকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন।  এতে তার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। আর ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন রোম সম্রাট ক্রাডিয়াস।  আর যায় কোথায়, ভ্যালেন্টাইনকে তিনি মৃত্যুদন্ড দিলেন।

সেই দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি।  রোমের শোকার্ত মানুষ, বিশেষ করে খৃষ্টান ধর্মানুসারীরা এদিকে তাদের একটি আবেগের দিন হিসেবে গণ্য করেন।  তারা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে শহিদী মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন।  ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও এই আবেগকে ধারণ করে ভ্যালেন্টাইনের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দেন।  তাঁর স্মরণে ১৪ ফেব্রæয়ারিকে “ভ্যালেন্টাইন ডে ” ঘোষণা করেন।  সেই থেকে দেশে দেশে এই দিবসের প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে।
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন সেই কবে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছেন।  বেঁচে থাকলে এই ভদ্রলোক খুবই খুশি হতেন, দীর্ঘ প্রায় দুই হাজার বছর পরে বাংলাদেশ নামে দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়ার একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে তাঁর নামে বিশেষ এই দিনটি পালিত হচ্ছে দেখে।  ১৯৯৩ সালে বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিক রেহমান বাংলাদেশে প্রথম এই দিনটি চালুর প্রয়াস নেন।  অনেক নাগরিক মজা করে তাকে ভ্যালেন্টাইন ডে’র আমদানীকারকও বলে থাকেন।

নতুন প্রজন্ম ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ কে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজে মেতে উঠলেও সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে তেমন চিনেই না।  কেবল উৎসবেই সার।  অপরদিকে বাংলা সন এর রঙিন মাস বসন্ত।  এটাকে ছয় ঋতুর রাজাও বলা হয়।  বৃক্ষ থেকে মরা, জীর্ণ শীর্ণ পাতা ঝরে পড়ে রঙিন রঙিন ফুলে পাতায় প্রকৃতি সেজে উঠে।
প্রেমিক প্রেমিকা, কপোত কপোতি, বন্ধু বান্ধবী –এক সাথে হাতে হাত ধরে চলা।  ফাগুণের রঙিণ আগুনে পুড়ে নতুন করে ভালোবাসায় সিক্ত হতে চায়।  আপাত দৃষ্টিতে এই হচ্ছে এই বিশেষ দুটি দিবসের মর্মবানী।  এ দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে ফুল চাষি আর ব্যবসায়িরা নতুন করে পসরা সাজায়।  ঝিমিয়ে পড়া বানিজ্য অনেক চাঙ্গা হয়।  একেকটি লাল,কিংবা রঙিন গোলাপ ১০/১৫ টাকা থেকে লাফিয়ে ৫০/৭৫ টাকা অতিক্রম করে।  ১৫ টাকার হলুদ গাঁদার লহর উচ্চ লাফে ৭০/৭৫ টাকায় পৌঁছে যায়।  তবুও উৎসব বলে কথা, একটা দিন এই আনন্দের মাঝে হারিয়ে যেতে চায় সবাই।