ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় অবরুদ্ধ গাজায় নিহতের সংখ্যা ৯ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে ।আর নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই চার হাজারের বেশি।
সোমবার (৬ নভেম্বর) সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয় ,ইসরায়েলের এই হামলা থেকে বাদ যাচ্ছে না গাজার মসজিদ, গির্জা, স্কুল, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবিরসহ বেসামরিক মানুষের বাড়ি-ঘর সহ কেোনো অবকাঠামো।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় চলমান যুদ্ধে অন্তত ৪ হাজার ৮ শিশু নিহত হয়েছে এবং গত এক মাসে প্রায় ইসরায়েলি বোমা হামলায় মৃতের সংখ্যা ৯ হাজার ৭৭০ জনে পৌঁছেছে বলে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
গাজার আল-আকসা হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছে, রোববার বিকেলে মধ্য গাজার বুরেজি শরণার্থী শিবিরে একটি স্কুলের কাছে কয়েকটি বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় কমপক্ষে ১৩ জন নিহত হয়।
ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি ফর প্যালেস্টাইন রিফিউজিস (ইউএনআরডব্লিউএ)-এর নিবন্ধিত প্রায় ৪৬ হাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থীর আবাসস্থল হচ্ছে গাজা উপত্যকার মাঝখানে অবস্থিত বুরেজ ক্যাম্পটি যা তুলনামূলকভাবে ছোট শরণার্থী শিবির।গত বৃহস্পতিবারও এই শিবিরে ইসরায়েলি হামলার ঘটনাতে ১৫ জন নিহত হন।
ইসরায়েল বলছে, সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের কমান্ডারদের লক্ষ্যবস্তু করছে তারা। যদিও ইসরায়েলের হামলায় নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।
ইসরায়েল গত শনিবার রাতে গাজা ভূখণ্ডের মাগাজি শরণার্থী শিবিরে হামলা চালায় । আল-মাগাজি ক্যাম্পের বাসিন্দা আরাফাত আবু মাশাইয়া বলেন, ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্যাম্পের বেশ কয়েকটি বহুতল বাড়ি চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। সেখানে গাজার অন্যান্য অংশ থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লোকজন আশ্রয় নিয়েছিলেন।
ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে সত্যিকারের গণহত্যা চালানো হয়েছে। এখানে সবাই শান্তিপ্রিয় মানুষ। যারা বলে এখানে প্রতিরোধ (যোদ্ধা) ছিল, আমি তাদের যে কাউকেই চ্যালেঞ্জ জানাব।’
সাইদ আল-নেজমা বলেছেন, হামলার ঘটনার সময় তিনি তার পরিবারের সাথে ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সারা রাত, আমি এবং অন্যান্য লোকেরা ধ্বংসস্তূপ থেকে মৃতদের তোলার চেষ্টা করছিলাম। নিহতদের মধ্যে আমরা বাচ্চাদের পেয়েছি, টুকরো টুকরো, ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ পেয়েছি।’
আল জাজিরা সূত্রে জানা যায়, , রোববার চার ঘণ্টার বিরতি চলাকালীন ইসরায়েলি বিমানগুলো গাজায় আবারও লিফলেট ফেলে। সেখানে লোকদের গাজার আরও দক্ষিণে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পরে উপত্যকার উত্তর থেকে দক্ষিণে যাওয়ার প্রধান মহাসড়কে বহু মানুষকে পায়ে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। অনেকে গাধার-টানা গাড়িতে করে চলে গেছেন।
এক বাসিন্দা বলেন, ইসরায়েলি সৈন্যদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে হাত তুলে ৫০০ মিটার হাঁটতে হয়েছিল। অন্য একজন রাস্তার পাশে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িতে মৃতদেহ দেখার কথা বর্ণনা করেছেন। একজন ফিলিস্তিনি বলেছেন, ‘বাচ্চারা প্রথমবার ট্যাংক দেখেছে। হে বিশ্ব, আমাদের প্রতি করুণা করো।’
আল জাজিরার হানি মাহমুদ গাজার খান ইউনিসের কাছ থেকে বলেছেন, গাজার শরণার্থী শিবিরগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলাকে ‘পরিকল্পিত আক্রমণ’ বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মধ্য ও দক্ষিণ গাজার শরণার্থী শিবিরে বারবার এই ধরনের বিমান হামলার কারণেই মানুষ এখন আর ইসরায়েলি ঘোষণাকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে না।’
জাতিসংঘের মতে, গাজার ২৩ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ১৫ লাখ মানুষই এখন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একইসঙ্গে গত ৮ অক্টোবর থেকে গাজায় সর্বাত্মক অবরোধও আরোপ করে রেখেছে ইসরায়েল। এতে করে ফিলিস্তিনি নাগরিকরা খাদ্য, জ্বালানি, খাবার পানি ও ওষুধের সংকটে পড়েছেন।
তবে এতো নিন্দার পরও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গাজায় হামলা বন্ধের কোনও সম্ভাবনা দেখাচ্ছেন না।
বরং হুমকিস্বরূপ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বন্দিদের প্রত্যাবর্তন ছাড়া কোনও যুদ্ধবিরতি হবে না, আমরা আমাদের শত্রু এবং আমাদের বন্ধু উভয়কেই এটি বলছি। আমরা তাদের পরাজিত না করা পর্যন্ত হামলা চালিয়ে যাব।’