ড. আবুল বারকাতের জরিপ- নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আ’লীগ পাবে ১৬৬টি আসন

সুষ্ঠু নির্বাচন হলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৬৬টি আসন পেতে পারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারকাত। ড়শলভঠ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইস্কাটনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে বিএনপির এককভাবে সরকার গঠনের কোনো সম্ভাবনা নেই। দলটি সর্বোচ্চ ১৩৭টি আসন পেতে পারে। ‘ভোটারের মন বুঝে’ ও আগের চারটি ‘অপেক্ষাকৃত ভালো’ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে করা গবেষণাপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে জানান এ অর্থনীতিবিদ।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, আগামীতে আওয়ামী লীগের পক্ষে সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি দাবি করে গবেষণার তথ্য বলছে, ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৮ থেকে ১৬৬টি, বিএনপি ১১৯ থেকে ১৩৭টি এবং অন্যান্য দল ১৫টির মতো আসন পেতে পারে। সম্ভাব্য ফলাফলের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি। বিএনপির পক্ষে এককভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বিএনপির জোটবদ্ধ সরকার গঠনের সম্ভাবনা থাকলেও তা অনেক বেশি শর্তসাপেক্ষ।
দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৫টি আসনের ফলাফল মোটামুটি নির্ধারিত। এগুলো দলগুলোর জন্য ‘সম্ভাব্য বিজয় নিশ্চিত’ আসন। এর মধ্যে ৭০টি আসন পাবে আওয়ামী লীগ ও ৭০টি আসন পাবে বিএনপি। বাকি ১৫টি আসন পাবে অন্যান্য দল। তবে এই আসন দিয়ে সরকার গঠন নিরূপণ হবে না। অন্য ১৪৫টি সংসদীয় আসনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে হবে।
এছাড়া নির্বাচনে মোট ১১ কোটি ৯০ লাখ ভোটারের ৭০ শতাংশ ভোটারই দলের অনুগত ভোটার। তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশ আওয়ামী লীগের, ৩০ শতাংশ বিএনপির আর ১০ শতাংশ অন্যান্য দলের। আর এর বাইরের ৩০ শতাংশ ভোটার দলীয় অনুগত নন। এই দোদুল্যমান ৩০ শতাংশ ভোটার কাকে ভোট দেবেন, তা পূর্বনির্ধারিত নয় বলে গবেষণার ফলাফলে উল্লেখ করা হয়।
যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির মাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফলে উপনীত হয়েছে দাবি করে অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত বলেন, আসন্ন নির্বাচনে কোন দলের অবস্থা কেমন হতে পারে, তা জাতীয় কৌতূহলের বিষয়। গত কয়েকটি নির্বাচনের তথ্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় নির্বাচনী কারসাজি, প্রহসন, জোরজবরদস্তি, টাকাপয়সার খেল- এসব স্থান পায়নি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো গবেষণা একটি প্রধান অনুসিদ্ধান্ত মেনে করা হয়েছে। সেটি হলো- আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক। যেখানে সব দল, প্রার্থী ও ভোটারের জন্য নির্বাচনী মাঠ হবে সমান-সমতল।
গবেষণার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আবুল বারকাত বলেন, এই গবেষণা কেউ করাননি। শতভাগ ব্যক্তিগত উদ্যোগ। ছয় মাস আগে মনে হচ্ছিল, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেক কিছু হবে। আমি ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, অর্থনৈতিক সমিতির গবেষণার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু গবেষণা ফলাফল তুলে ধরার আয়োজন করেছে অর্থনীতি সমিতি।
গবেষণায় বলা হয়, দেশের মোট ১৫৫টি ভিত্তি আসনের মধ্যে ৪৫টি (২৯ শতাংশ ভিত্তি আসন) আছে কেবল পদ্মাসেতু কেন্দ্রিক-দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে, আর ১১০ টি (৭১ শতাংশ ভিত্তি আসন) আছে পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর অঞ্চলে। ভিত্তি আসন এর তুলনামূলক আধিক্যে ভৌগলিক বিভাজনটা এ রকম: দেশের দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে মোট আসনসংখ্যা (৬৮টি) সারাদেশের মোট আসনের ২২.৭ শতাংশ হলেও এ অঞ্চলে ভিত্তি আসনসংখ্যা সারাদেশের ভিত্তি আসনসংখ্যার ২৯ শতাংশ, আর ঢাকাসহ দেশের পূর্ব পশ্চিম-উত্তর অঞ্চলের জন্য এসব অনুপাত যথাক্রমে ৭৭ শতাংশ ও ৭১ শতাংশ। পদ্মাসেতু কেন্দ্রিক অঞ্চল এর ১৯টি জেলার মোট ৬৮ টি আসনের মধ্যে মোট ভিত্তি আসন সংখ্যা ৪৫টি (এ অঞ্চলের মোট আসনের ৬৬.২ শতাংশ)। এই এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের ভিত্তি আসন সংখ্যা বিএনপির চেয়ে বেশি- আ্ওয়ামী লীগের ২৫টি আসন, আর বিএনপির ১৬ টি। আবার ঢাকাসহ দেশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর অঞ্চলের ৪৯টি জেলার মোট ২৩২ আসনের মধ্যে মোট ভিত্তি আসন সংখ্যা ১১০টি। (এ অঞ্চলের মোট আসনের ৪৭.৪ শতাংশ) এই অঞ্চলে বিএনপির ভিত্তি আসন সংখ্যা আওয়ামী লীগের ভিত্তি আসনসংখ্যার তুলনায় বেশি-বিএনপির ৫৪টি, আর আওয়ামী লীগের ৪৫টি।
ভিত্তি আসনের ব্যাখ্যায় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি জানায়, যে ‘ভিত্তি আসন’-এর দলবন্টন একধরণের ভৌগলিকত্ব অনুসরণ করে। দেশের দিক্ষণ-দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে- গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, খুলনায় আওয়ামী লীগের ভিত্তি আসনসংখ্যা বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি; আবার পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায়- ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট ও চট্টগ্রামে বিএনপির ভিত্তি আসনসংখ্যা আওয়ামী লীগের তুলনায় অনেক বেশি; উত্তরাঞ।চলের রংপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে জাতীয় পার্টির ভিত্তি আসনসংখ্যা অন্যসব দলের তুলায় বেশি। এসবের কার্যকারণ রাজনীতি বিজ্ঞানীদের ভেবে দেখতে বলেছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারকাত।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যে ১৪৮-১৬৬ আসন পেতে পারে তার মধ্যে ৭০টি ‘ভিত্তি আসন’ বাদবাকি ৭৮-৯৬টি আসন ‘বিজয় অনিশ্চিত আসন’ এর অংশ। আওয়ামী লীগের প্রাপ্তি-সম্ভাব্য ১৪৮-১৬৬ আসনের মধ্যে ৪৮ আসন আসবে দেশের দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল থেকে, আর ১০০-১১৮ আসন আসবে ঢাকাসহ দেশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তরাঞ্চল থেকে। তবে বিএনপি যে ১১৯-১৩৭টি আসন পেতে পারে, তার মধ্যে ৭০ টি ‘ভিত্তি আসন’ আর বাদবাকি ৪৯-৬৭ আসন ‘বিজয় অনিশ্চিত আসন’-এর অংশ। বিএনপির প্রাপ্তি-সম্ভাব্য ১১৯-১৩৭ আসনের মধ্যে ১৬ আসন আসবে দেশের দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল থেকে আর ১০৩-১২১ আসন আসবে ঢাকাসহ দেশের পূর্ব-পশ্চিম-উত্তরাঞ্চল থেকে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারকাত জানান, সম্ভাব্য চুড়ান্ত ফলাফল বহাল থাকলে আওয়ামী লীগের পক্ষ্যে জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠন সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে জোট হতে হবে জাতীয় পার্টির সাথে। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষে এককভাবে সরকার গঠন সম্ভব হতে পারে যদি তাদের আসন সংখ্যার গতিমুখ সর্বোচ্চ সম্ভাব্য-আসনমুখী হয় অর্থাৎ সর্বনিম্ন ১৪৮ আসন থেকে ১৬৬ আসনমুখী হয়।
তিনি বলেন, চুড়ান্ত ফলাফল যদি বহাল থাকে, তাহলে বিএনপির পক্ষে এককভাবে সরকার গঠন সম্ভাবনা নেই। তবে বিএনপির পক্ষে জোটবদ্ধ সরকার গঠনের পাটিগাণিতিক সম্ভাবনা যতটুকু আছে, তা যথেষ্ট শর্তসাপেক্ষ। এক্ষেত্রে বিএনপিকে অবশ্যই সম্ভাব্য সর্বোচ্চসংখক আসন প্রাপ্তি (১৩৭) নিশ্চিত করে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য সবার সাথে জোটবদ্ধ হতে হবে এবং একই সাথে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা কোনো অবস্থাতেই সম্ভাব্য সর্বনিম্নসংখ্যক (১৮৪) এর বেশি হতে দেয়া যাবে না। সুতরাং এতো বেশি শর্ত সাপেক্ষ যে, বিএনপির পক্ষে জোটবদ্ধ সরকার গঠনের বাস্তব সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।